অতিমারিকে উপেক্ষা করে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে আন্দোলনে উত্তাল পোল্যান্ড

  • Politics
গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে আন্দোলন

কৃষ্ণা মীরা রায়

২০২০ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পোল্যান্ডে তিনটি কারণে গর্ভপাত আইনসিদ্ধ ছিলঃ

১) যদি ভ্রূণের বৃদ্ধির ফলে গর্ভবতী মহিলার স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি বা জীবনহানির আশঙ্কা থাকে  

২) যদি কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কারণে কোনো মহিলা গর্ভবতী হয়ে পড়েন

৩) চিকিৎসার দ্বারা সুস্থ না হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে  এমন ত্রুটিযুক্ত কোনো ভ্রূণ তৈরি  হলে

২২ অক্টোবর, ২০২০ পোল্যান্ডের কনস্টিটিউসনাল ট্রাইবুনাল কোর্ট তৃতীয় কারণ অর্থাৎ ত্রুটিপূর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত ভ্রূণের কারণে গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার রায় দেয়। এই রায় আইনি জর্নালে প্রকাশিত হলে কার্যকরী হবে। তৃতীয় কারণটি বাতিল হওয়ার অর্থ পোল্যান্ডে গর্ভপাত  প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া কারণ এদেশে বেশির ভাগ গর্ভপাত  ত্রুটিপূর্ণ ভ্রূণের কারণে হয়ে থাকে।

এই রায় বার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিমারির বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে পোল্যান্ডের সব শহরের মানুষ বিশেষত নারী  ও মানবাধিকার সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিভিন্ন সংবাদপত্রের রির্পোট অনুযায়ী ২৮ অক্টোবর বুধবার, পোল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে ৪০০টি সমাবেশে প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লক্ষ মানুষ এই রায়  বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ দেখান।

সরকার ও শাসক দলের পক্ষ থেকে অতিমারি সংক্রান্ত আইন ভাঙ্গার শাস্তির ভয় দেখিয়েও বিক্ষোভে রাশ টানা যায় এই নি। রায় বার হওয়ার পর একটানা ন’দিন পোল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চলতে থাকে। ৩০ অক্টোবর,শুক্রবার পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ শহরে প্রায় এক থেকে দেড়লক্ষ মানুষ এই রায় বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভে সামিল হন।

আশির দশকের সলিডারিটি আন্দোলনের পর (যার ফলে তৎকালীন সরকারে পতন হয়) এতবড় আন্দোলন এদেশে দেখা যায় নি।

বিক্ষোভকারীরা কখনও সরকারি দপ্তরের সামনে, কখনও কোর্ট চত্বরে আবার কখনও চার্চের সামনে জমায়েত হচ্ছেন। মনে করা হচ্ছে সরকারের সাথে গোপন বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই কোর্ট এই রায় দিয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যে দেশের জনসংখ্যার ৮৯.৮%  রোমান ক্যাথলিক সেই দেশের চার্চের বিরুদ্ধে এই পরিমাণ বিক্ষোভ। যে বিক্ষোভের ফলে অনেক চার্চের ‘সার্ভিস’ ব্যাহত হয়েছে। পোযান ও অন্য একটি শহরের  চার্চে রবিবারের ‘মাস’ সুষ্ঠুভাবে করা যায় নি। এই চার্চের সামনে বিক্ষোভকারী নারীরা পোষ্টার হাতে নিয়ে বসে পড়েছেন। কোনো পোষ্টারে লেখা আছে ‘I wish I could abort my Government’ , কোনোটাতে লেখা , ‘ we are sick of this’,

ক্যাথলিক চার্চের সমালোচকদের মতে পোল্যান্ডে সরকারি নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে চার্চ বেশ ভাল মাত্রায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করে।

চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে একজন তরুণী বলেন, ‘আজ আমি এখানে এসেছি কারণ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে  আমার কী অধিকার থাকবে, আমি কোন কাজ করতে পারবো বা পারবো না তা চার্চ ঠিক করে দেবে, এটা অত্যন্ত বিরক্তিকর।’ বিক্ষুব্ধ নারীরা চার্চের দেওয়ালে পোস্টার সেঁটে দিয়ে আসে যাতে লেখা ছিলো ‘নারীর জন্য নরক’, ‘শর্তহীন গর্ভপাত’।

বিক্ষোভকারীদের মিছিলের পোস্টারে  ‘আমাদের শরীর আমাদের সিদ্ধান্ত’, ‘ আমাদের শরীর শিশু তৈরি করার ইনকিউবিটার নয়,’ ‘প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সিদ্ধান্ত থেকে ভ্রূণের বেশি গুরুত্ব’ ইত্যাদি লেখা ছিল।

কনস্টিটিউসনাল ট্রাইবুনালের এই রায়টি চূড়ান্ত, এর বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা যাবে না।

এই রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কাউন্সিল অফ ইউরোপের হিউম্যান রাইট কমিশনার ডুনজা মিজাটভিক এর নিন্দা করে বলেন, ‘আজ মেয়েদের জন্য খুব দুঃখের দিন।  এই রায়ের ফলে পোল্যান্ডে গোপনে বিপদজ্জনক গর্ভপাতের  ঘটনা বাড়বে এবং যাদের ক্ষমতা আছে তারা বিদেশে গিয়ে  নিরাপদে গর্ভপাত করাবে। ‘

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে গতবছর পোল্যান্ডে আইনি গর্ভপাত হয়েছিল  ১১১০ টি  আর নারী-অধিকার কর্মীদের দাবি অনুযায়ী সেই সংখ্যা ১৫০,০০০।

গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে
ছবি : আল জাজিরা

এই রায় কিভাবে পোল্যান্ডের নাগরিকদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে

  প্রথমত, প্রজননের অধিকার একজন মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, সেখানে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, গর্ভস্থ ভ্রূণ নষ্ট অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়ত চিকিৎসায় সুস্থ হবে না এমন প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম দিতে, তার দেখভালের দায়িত্ব নিতে, এমন কী তার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে বাধ্য করা  হয়েছে।

চতুর্থত পোল্যান্ডের নারীদের স্বাভাবিক যৌন সক্রিয়তার উপর ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি করে এক  বিরাট সুদূরপ্রসারী চাপ তৈরি করা হয়েছে।

এসব কিছুর উপর এই চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্বের জন্য যে অর্থ দরকার তার প্রধান দায়িত্বও সেই বিপন্ন গর্ভবতীকেই নিতে হবে।

পোল্যান্ডের নারীরা এই আসন্ন বিপন্নতা থেকে মুক্তি পেতে আত্মরক্ষার জন্য লড়ছেন।

জন্মনিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাতবিরোধী রাজনীতির দুষ্টচক্র

শুধু পোল্যান্ডে নয় পৃথিবীর দেশে দেশে শাসকদের গৃহীত নীতির ফলে নারীরা নিজেদের শরীরের উপর

 সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার হারিয়েছে। কোনো দেশে যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজন হয়েছে তখন অধিক সংখ্যক সন্তানের মাকে পুরস্কৃত করে, গর্ভপাত বেআইনি করে জনসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আবার জনসংখ্যা যখন কমানোর দরকার হয়েছে তখন গর্ভপাত সহজ  করা হয়েছে এবং শিশুজন্মের সংখ্যা  সীমিত করার জন্য নানাভাবে প্রচার করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ১৯২০ থেকে ১৯৩৬ সাল-এই সময়ের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে মেয়েরা চাইলেই বিনামূল্যে  কোনো গোপনীয়তা ছাড়াই সরকারী হাসপাতালে গর্ভপাত করাতে পারতেন। সেই সোভিয়েত রাশিয়াতেই ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত

শুধুমাত্র স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে এমন কারণ ছাড়া গর্ভপাত সম্পূর্ন নিষিদ্ধ করা হয়।

গ্রীসে ১৯৮০-৯০ দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এত কমে যায় সে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ঘোষণা করতে হয়েছিলো দেশের স্বার্থে নারীদের বেশি সন্তানের জন্ম দেওয়া উচিত।

বিপরীত উদাহরণ হিসাবে ভারত বা চীনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

ভারতে গর্ভপাতের জন্য আইনে অনেক শর্ত দেওয়া থাকলেও বাস্তবে গর্ভপাত মোটামুটি সহজভাবেই করা যায়। কারণ এদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি হওয়ায় দেশের নীতি নির্ধারকদের এ নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই।

 ১৯৭০ দশক থেকেই চীনে জনসংখ্যাবৃদ্ধি রোধ করার জন্য গর্ভপাত আইন সহজ করা হয়, নারীরা অনুরোধ করলেই সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে গর্ভপাত করানো হয়। 

 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পোল্যান্ডের জনসংখ্যা খুব কমে যাওয়ায় গর্ভপাত প্রায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।

কোনো ভ্রূণের বৃদ্ধির ফলে প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য বা জীবনহানির আশঙ্কা থাকলে বা কোনো অপরাধের ফলে ভ্রূণ সৃষ্টি হলে শুধুমাত্র সেই ক্ষেত্রে গর্ভপাত করা যেত। এই সময় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জাতিকে প্রাণবন্ত করার জন্য জনসংখ্যাবৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হয়। ফলে পোল্যন্ডে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়।

অন্যদিকে আইনি গর্ভপাত প্রায় অসম্ভব হওয়ায় যে নারীরা নিজেদের সিদ্ধান্তে গর্ভপাত করাতে চান তাঁরা বেআইনি বিপজ্জনক পদ্ধতি গ্রহণ করতে শুরু করেন; ফলে অনেক মহিলার মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে থাকে। তাই নারীদের প্রাণ বাঁচাবার জন্য দেশের নীতি নির্ধারকরা গর্ভপাত আইনে পরিবর্তন আনার কথা ভাবতে শুরু করেন এবং ১৯৫৬ সালে  পোল্যন্ডে সামাজিক কারণে গর্ভপাত আইনসিদ্ধ করা হয়। (এখানে উল্লেখ করা দরকার ১৯৪৪ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত পোল্যান্ড    সোভিয়েত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রনে ছিল।)

 ১৯৮৩ সালে পোল্যান্ডে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চে পৌঁছয়, তখন যা ছিল ২.৪; কিন্তু বৃদ্ধির হার ১৯৯৩ সালে ১.৮ এবং ২০০৫ সালে নেমে দাঁড়ায় ১.২২। ফলে গর্ভপাত বন্ধ করার জন্য আরো কঠোর আইন তৈরি করার প্রস্তুতি শুরু হতে থাকে।

‘দেশে জন্মহার বৃদ্ধি দরকার তাই পোল্যান্ডের নারীদের আরও শিশুর জন্ম দিতে হবে।’ এই হল শাসকের যুক্তি।

২০১৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর গর্ভপাত নিষিদ্ধ করার জন্য বিল আনা হয়। তার প্রতিবাদে ছোট, বড় বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

৩ অক্টোবর হাজার হাজার নারী পথে নেমে আসেন। এই বিক্ষোভের নাম দেওয়া হয় কালো সোমবার । এই বিক্ষোভ সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে, এমনকী হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীরা এই প্রতিবাদে যোগ দেয়।

কালো প্রতিবাদ পোল্যান্ডের গন্ডী ছাড়িয়ে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এমনকী চীনেও ছড়িয়ে পড়ে।

এই  কালো প্রতিবাদ -র  প্রতীক হয়েছিল ছাতা এবং কোট হ্যাঙ্গার।

২০১৬, ৩ অক্টোবর, অবিরাম বৃষ্টি পড়ছিল। সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী ছাতা মাথায় দিয়ে  রাস্তায় নেমে পড়ে ফলে বিক্ষোভ সমাবেশ ছাতার সমুদ্রে পরিণত হয়। প্রতীক হিসাবে ছাতা একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে; বৃষ্টি থেকে জনসমুদ্রকে বাঁচিয়ে ছাতা যেন প্রস্তাবিত আইন থেকে বাঁচানোর এক প্রতীক হয়ে উঠে।

প্রতিবাদ মিছিলে হাতে হাতে ধরা ছিল আর একটি  প্রতীক, কোট হ্যাঙ্গার, গর্ভপাতের জন্য ব্যবহৃত আদি যন্ত্র। গর্ভপাতবিরোধী অবস্থানের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকেও দেশের নাগরিকরা প্রচুর কোট হ্যাঙ্গার পাঠিয়েছিলেন। এই তীব্র বিক্ষোভের  ফলে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়, প্রস্তাবিত বিল আইনে পরিণত হতে পারে না।

এই বিক্ষোভের স্মৃতি সরকার এবং কনস্টিটিউসনাল ট্রাইবুনাল কোর্টের স্মরণে ছিল ; তাই অতিমারির বিধিনিষেধের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই আইন কঠোর করার  ডিক্রি জারি করা হল।

কিন্তু এই অধিকার কেড়ে নেওয়ায় যে ক্ষোভ আর বিপন্নতা সৃষ্টি হল তা অতিমারির শাস্তির ভয়কে পরাস্ত করল।

সরকার পিছু হটল। জানানো হল এই অতিমারির বিপদের সময় গর্ভপাতের আইন নিয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা হবে । এই কোর্টের রায় যেহেতু চূড়ান্ত তাই তার বিরুদ্ধে আপিলে যাওয়া যাবে না কিন্তু পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট  আন্ড্রযেজ ডুডা প্রস্তাব দেন যে  গর্ভপাত আইন নিয়ে নতুন বিল আনা হবে । ভবিষ্যৎ বলবে সেই আইন কী হবে । আমাদের প্রত্যাশা থাকবে পোল্যান্ডের মানবাধিকার কর্মী ও নারীরা নিজেদের শরীরের উপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে খুব তাড়াতাড়ি সেই অধিকার আদায়ে  সফল হবেন।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *