বিজ্ঞানচিন্তার গতিপ্রকৃতি ও কয়েকজন ফরাসি ভাবুক

  • Culture
Gaston-Bachelard

অরিন্দম চক্রবর্তী

‘কাজ করে যাও, ফলের আশা কোরো না’ – এই আপ্তবাক্যটি আজকের কর্মব্যস্ত জীবনের সঙ্গে বেশ কিছুটা খাপ খেয়ে গেছে। তবে কারোর আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করাটা বেশ সয়ে গেলেও, বা তথাকথিত সৎ, সুবিবেচক বা নিষ্ঠাবান মানুষের পরিচয় হলেও ফলের আশা করাটা মানুষ কিছুতেই ছাড়তে পারছে না। ফলে কাজ করার আগে না হলেও, করার সময় বা পরে ফলের চিন্তা সে করবেই। তবে কাজের শুরু থেকে ফল পাওয়া বা না-পাওয়া পর্যন্ত মানুষটা তো একই থেকে যাবে না – তার বয়স বাড়বে, বাড়বে অভিজ্ঞতা, এবং সর্বোপরি ফল পাওয়া বা না-পাওয়ার উপর নির্ভর করবে তার মনের অবস্থা। এরকম একজন মানুষকে যদি আমরা বিজ্ঞানী ধরে নিই তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, তিনি তথাকথিত সাধারণ মানুষের তুলনায় পৃথক কোথায়? বিশদে যাওয়ার আগে প্রচলিত উত্তরগুলো জানানো যাক – যেমন বিজ্ঞানীর কাজ কোনো না কোনো প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তা থেকেই তৈরি হয়, বা বিজ্ঞানী সত্যের অনুসন্ধান করেন, বা দৃশ্যমান বা অনুভূত ঘটনার ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করেন, বা কার্যকারণ সহযোগে ঘটনার ব্যাখ্যা করেন ইত্যাদি। ফলে নাকি বিজ্ঞানের অনুশীলন ও তজ্জনিত সৃষ্টির ক্ষেত্রে থেকে যাচ্ছে একটি চিন্তার জগৎ, যা কিনা আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক চিন্তার সঙ্গে একরকম নয়। এতে করে বিজ্ঞান গবেষণা থেকে উঠে আসে কোনো নতুন সত্য, বা কোনো সমাধান সূত্র, কোনো প্রয়োগযোগ্য যন্ত্র বা ধারণা ইত্যাদি। কিন্তু যেদিন থেকে মানুষ এটা বুঝতে পারল যে চিন্তারও একটা ইতিহাস আছে সেদিন থেকে এই সহজ-সরল উত্তরগুলো কেমন যেন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দর্শনের একটা ত্রিমুখী গোলকধাঁধা, যার জটিলতা বিশ্লেষণে আমরা এসে পড়ব বিংশ শতাব্দীর কয়েকজন ফরাসি ভাবুকের কাছে।

ইউরোপের মধ্যযুগ-এর অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলে একটা অখ্যাতি আছে – অন্তত ইতিহাসের পাঠ্যবইতে যা পড়েছি। তার মানে এই নয় যে অন্ধতা, সংস্কারাচ্ছন্নতা ইত্যাদিই কেবল মধ্যযুগের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। জ্ঞানচর্চার সময় ও সুযোগ যাঁরা পেতেন (যথা খ্রিস্টান স্কুলম্যানরা) তাঁরা ধর্মতত্ত্ব চর্চার পাশাপাশি গ্রিক, প্রধানত অ্যারিস্টটলিয় জ্ঞানচর্চাও চালাতেন। এই ধরণের জ্ঞানচর্চার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল যে আলোচনার শুরুতে কার্যকারণ বা যুক্তিতর্কের প্রাধান্য থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত ধর্মপুস্তকের (Scripture) কোনো তথাকথিত পবিত্র ধারণাতে পর্যবসিত হত। পূর্বকথিত কোনো বিশ্বাসকে পুনরায় সত্য বলে প্রমাণ করাই ছিল এই ধরণের যুক্তিতর্কের প্রধান উদ্দেশ্য। ব্যাপারটাকে বলা যেতে পারে বিশ্বাসের যুক্তিকরণ (Rationalization of faith)। ধর্মগুরু সেন্ট আনস্লম সম্পর্কে বলতে গিয়ে G.R. Evans বলছেন – “When Anselm says that men should use their reason to help them understand their faith he intends them to do so only in order to understand what they ought already to believe, and not to seek out new items of faith so as to extend the range of their belief.”[1] মধ্যযুগের শেষের দিকে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরণের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান (যথা বিশ্ববিদ্যালয়) তৈরি হতে থাকে; এই প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ম-কানুন, চাহিদা, কর্মপদ্ধতি, পরিচালনার আদর্শ ইত্যাদি তৈরির প্রয়োজনীয়তা থেকে জন্ম নেয় এক ধরণের স্বকীয় চিন্তাপদ্ধতির প্রবণতা। যুক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাঁধে নানাবিধ ঈশ্বরকেন্দ্রিক উদঘাটন তত্ত্বের (Revelation)। ফলে কারণ বা যুক্তিকে কেবলমাত্র বিশ্বাসের নিগড়ে বেঁধে রাখা গেল না, তার মধ্যে দেখা দিল এক ধরণের বহির্মুখীতা – এক ধরণের সম্ভাব্য, স্বকীয় বিন্যাস যা কিনা কোনো ধরণের কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য বা বিশ্বাস ছাড়াও গড়ে উঠতে পারে। এই অবস্থাটাকেই Edward Grant-এর ভাষায়, আমরা বলব Secularization of reason বা যুক্তির ধর্মনিরপেক্ষতা।[2] ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রথম দিকটায় এই প্রবণতা থেকেই জন্ম নেয় একাধিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, বাড়তে থাকে প্রকৃতিকেন্দ্রিক দর্শনগুলির প্রাধান্য। এরকমই এক দৃষ্টিভঙ্গির দাবিদার হলেন যুক্তিবাদী দার্শনিক রেনে দেকার্ত।

ফরাসি দর্শনচর্চার আদি পুরুষ দেকার্ত-কে দুভাবে পড়া যেতে পারে। ‘ডিসকোর্স অন মেথড’ বইতে দেকার্ত বোদ্ধাকে দেখালেন জ্ঞানার্জনে লিপ্ত একজন দার্শনিক রূপে, যিনি কিনা নানা পদ্ধতির বুনোটের মধ্যে দিয়ে জ্ঞানলাভ করছেন,[3] আবার ‘মেডিটেশন’ বইতে বললেন, জ্ঞান স্বজ্ঞানির্ভর, আপাত অনুভূত এবং তাৎক্ষণিক।[4] তাহলে কোনটা ঠিক? দেকার্ত উত্তরে দুটি ধারণার পারস্পরিক নির্ভরশীলতার কথা বলবেন, বলবেন চিন্তার স্রোতকে একত্রিত করতে (unification), কোনো প্রাসঙ্গিক নিয়ম-শৃঙ্খলার অনুসন্ধান করতে। আর তা করার জন্য চিন্তাকে শুধু সাজালেই হবে না, সেই সজ্জা সম্বন্ধে অবহিত হতে হবে। কোনো ধারণায় শুধু উপনীত হলেই চলবে না, কী করে সেই ধারণায় পৌঁছলাম সেটাও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এরকম একজন বোদ্ধাকে আমরা কার্তেসিয় বোদ্ধা বলব। সমস্যা হল এরকম একজন বোদ্ধা যখন দাবি করে বসবেন, বোধ একটি বাস্তবিক (Real) এবং বোদ্ধানিরপেক্ষ সত্য হতে হবে, যার নিশ্চয়তা সম্বন্ধে যাতে সন্দিহান হওয়ার কোনো জায়গা না থাকে। কিন্তু এই নিশ্চয়তা তাকে দেবে কে? দেকার্ত বললেন, কোনো পার্থিব বোদ্ধার পক্ষে এই পরিপূর্ণতায় আসা সম্ভব নয় – দরকার একজন সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের, কেবল তারই নাকি এই পরিপূর্ণতা থাকতে পারে। লক্ষণীয়, দেকার্ত যেন কিছুটা মধ্যযুগীয় চিন্তাবিদদের মতো কথাবার্তা বলছেন, তবে সবকিছু বিশ্বাসে মিলিয়ে না দিয়ে তর্কে অন্তত কিছুদূর নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের। ঈশ্বর পর্যবসিত হচ্ছেন এক ধরণের যুক্তিবাদী ধারণায় বা শর্তে (concept/idea/criteria)। সত্যি বলতে কী সুদূর অতীতে যখন গ্রিস দেশে দর্শন চর্চার গোড়াপত্তন হয়েছিল, তার পেছনেও ছিল এই ধরণের ঈশ্বরকেন্দ্রিক বিমূর্তায়ন। W.K.C. Guthrie-র কথায় – “It occurred when the conviction began to take shape in men’s minds that the apparent chaos of events must conceal an underlying order, and that this order is the product of impersonal forces.”[5] এরকম ধরণের চিন্তা-ভাবনার বশবর্তী হয়েই পরবর্তীকালে গ্রিকদের চিন্তায় জন্ম নিয়েছিল প্রদত্ত জগৎ (physis) এবং মানবকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার জগৎ (nomos) – এক ধরণের বিভাজনের ধারণা, এক ধরণের লঙ্ঘন, যা এমনকী নবজাগরণের পরবর্তী সময়তেও পশ্চিমী দর্শনে এক বড় জায়গা দখল করে। আর এই চিন্তাই আঁতুড়ঘর হয়ে উঠবে নানা ধরণের ‘অধিবিদ্যা’ (metaphysics) নির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক থিওডোর অ্যাডোরনো বলেছেন –

“One might define metaphysics as the product of a breach between essences – the gods secularized as ideas and the phenomenal world, a breach which is inevitable as soon as gods become concepts and being becomes a relation between existing things; at the same time, however, these two moments cannot be naively related together or formulated concurrently.”[6]

এখন মজার ব্যাপার হল ‘অধিবিদ্যা’ নিয়ে দর্শনের জগতে যুগে যুগে টানাপোড়েন চললেও বিজ্ঞানের জগতে, বিশেষ করে গণিত, পদার্থবিদ্যা এবং গাণিতিক পদার্থবিদ্যার জগতে একদিকে যেমন অধিবিদ্যার ব্যাপক রমরমা লক্ষ করা যায়, তেমনই দেখা যায় প্রথাগত বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ অনুশীলনকারীদের মধ্যে এক ধরণের ঔদাসীন্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ধ্রুপদী বলবিদ্যা (Classical Mechanics)-র পরিকাঠামোতে সৌরজগৎ বর্ণনার প্রাথমিক ভিত্তি হল একটি গতীয় সমীকরণ, যার সমাধান করার চেষ্টা হত নির্দিষ্ট কিছু সীমানা শর্তের ভিত্তিতে, যাতে সৌরজগতটি সম্ভবপর হতে পারে। এই গতীয় সমীকরণ ও তার উপর প্রযোজ্য শর্তগুলি প্রাকৃতিক নিয়মগুলির মধ্যে এক ধরণের আবশ্যিকতা দাবি করত। বর্তমান দিনের বিভিন্ন ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্বের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। দার্শনিক আয়ান হ্যাকিং বলছেন,[7] “Such a cosmology is not far removed from Galileo’s theism and his picture of god writing the book of nature. The author of nature writes down the equations, then fixes the fundamental constants, and finally chooses a series of boundary conditions.” দর্শনের পরিপ্রেক্ষিত থেকে আরও বলা যায় যে দীপায়ন-পরবর্তী কয়েক শতকে বলবিদ্যা-নির্ভর নির্ধারণবাদের (Determinism) প্রভাব পদার্থবিদ্যার জগতে এতটাই বেশি ছিল যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমনকী তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্যও ভরযুক্ত কণার বলবিদ্যাই ছিল একমাত্র সম্বল, আর সম্ভাবনার সূত্র (Laws of probability) ব্যবহারের কথা তো ভাবাই যেত না। তবে ঊনবিংশ শতাব্দী শেষ হতে না হতেই কণাবিহীন তরঙ্গ ও পরিসংখ্যান বলবিদ্যার (Statistical mechanics) চর্চা ব্যাপক আকার ধারণ করে। এই সময় থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আপেক্ষিকতাবাদ, কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আবিষ্কার পদার্থবিদ্যার জগতে কোনো একক ভিত্তিমূলক প্রস্তাবনার অস্তিত্বকে খারিজ করে দিতে থাকে। প্রশ্ন ওঠে কার্তেসিয় ধারণার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। আর এরকমই কিছু ধারণা এনে হাজির করলেন বিজ্ঞানের দার্শনিক গস্তঁ ব্যাশেলার।

প্রথম জীবনে রাইমারমন্টের পোস্টাল ক্লার্ক ব্যাশেলার-এর ছিল পড়াশোনার প্রতি তীব্র আগ্রহ। ১৯১২ সালে সেন্ট লুই থেকে ম্যাথাম্যাটিকাল সায়ন্সে লাইসেন্স ডিগ্রি পাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে শুরু হয়ে গেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিখাতেই কেটে গেল ৩৮ মাস। ফিরলেন Croix de Gruerre সম্মান নিয়ে। এরপর নিজের জন্মস্থান বার-সুর-আউব-এ পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের অধ্যাপক নিযুক্ত হলেন ১৯১৯ সালে। তিন বছরের মধ্যেই দর্শনের ডিগ্রি হাতে দর্শনের অধ্যাপক নিযুক্ত হলেন ওই একই কলেজে। পাঁচ বছরের মধ্যে দর্শনের পি.এইচডি. ডিগ্রি নিয়ে ডিজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ক্লাসে দর্শনের কঠিন তত্ত্বকে অতিসরলীকরণ না করেও প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা উপস্থাপনে ব্যাশেলারের বিশেষ পারদর্শীতা লক্ষ করা গেল। ছাত্রদের মধ্যে হয়ে উঠলেন Gaston – the magician। এই সময় থেকে বেরোতে থাকে ব্যাশেলারের মৌলিক গবেষণা-নির্ভর বইগুলি, যার বিষয়বস্তুর ব্যাপ্তি এতটাই বিস্ময়কর যে ব্যাশেলারের কোনো এক ধরণের কাজের সঙ্গে পরিচিত কোনো ব্যক্তি তাঁর অন্য ধরণের কাজের সম্বন্ধে প্রায়শই অবহিত থাকেন না – জ্ঞানতত্ত্ব, বিজ্ঞানের দর্শন থেকে শুরু করে মনস্তত্ত্ব, স্বপ্ন, সাহিত্য সমালোচনা, কবিতা সবকিছুতেই গবেষণামূলক কাজের পরিচয় দিয়েছিলেন ব্যাশেলার। ১৯৪০-১৯৪৯ সাল পর্যন্ত সোরবোনের History and Philosophy of Science-এর চেয়ার প্রফেসর থাকার পর ১৯৫৫ সালে অ্যাকাডেমি অফ মরাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স-এর কর্তা নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে প্যারিসে ব্যাশেলারের মৃত্যু হয়।

বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিজ্ঞান চর্চার গতিপ্রকৃতি দেখে ব্যাশেলার বললেন, “বোদ্ধা-নিরপেক্ষতা” বলে কিছু ভাবা আর সম্ভব নয়। বিজ্ঞান থেকে আমরা কী-কী জানতে পারি বা পারব তা সমসাময়িকতা, বিজ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের মাপকাঠির উপর নির্ভর করছে। বিভিন্ন যুগে বিজ্ঞানলব্ধ তথ্য ও ধারণার মধ্যে পার্থক্য থেকে যায় কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, আমরা কী জানতে চাইছি এবং কীভাবে জানতে চাইছি এই ব্যাপারটা যুগ-নিরপেক্ষ নয়, নয় যুগের সাপেক্ষে বোদ্ধার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান। ফলে ব্যাশেলারের দৃষ্টিতে অন্তত দুটি ধারণা পালটে গেল –

(১) অধিবিদ্যাগত ভিত্তি নির্ভরতার যুগ-নিরপেক্ষতা;

(২) বিজ্ঞানের ইতিহাসকে নতুন করে দেখার প্রয়োজনীয়তা।

প্রথমটিকে বোঝার জন্য ব্যাশেলার কার্তেসিয় জ্ঞানচর্চার দুটি প্রধান অনুমানকে প্রশ্ন করলেন –

(১) জ্ঞানতত্ত্বের নিরিখে কোনো প্রশ্নাতীত প্রারম্ভিকতা বা সন্দেহাতীত ভিত্তি আছে কি?

(২) জ্ঞানার্জনের জগতে কোনো পূর্বসুবিধাপ্রাপ্ত (privileged) বোদ্ধা কি সম্ভব যার কিনা সম্পূর্ণ জ্ঞানলাভের কোনো সম্ভাবনা আছে?

প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে ব্যাশেলার হাজির করলেন একটি কার্তেসিয় জ্ঞানতত্ত্ব[8] এবং তৎসহ বিজ্ঞানের দার্শনিকদের একটি সম্ভাব্য কর্তব্য: বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানচিন্তাকে কোনো অধিবিদ্যাগত সাধনার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যাবে না। অভিজ্ঞতা লাভের পদ্ধতি – তত্ত্ব নির্মাণ ও পরীক্ষাপদ্ধতির প্রকৃতির মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠবে দার্শনিক অবস্থান। ব্যাশেলারিয় জ্ঞানতত্ত্বের সমালোচক দোমিনিক ল্যাকোর্ট বলছেন – “…for Bachelard the meaning of science is to be found in its own activity rather than in a ‘philosophical ideology’ or ‘ideological philosophy’.”[9] ব্যাশেলার বলছেন, যেদিন থেকে আমরা অণু, পরমাণু ইত্যদি সংক্রান্ত সূক্ষ্ম ঘটনার (microphenomenon) জগতে ঢুকে পড়লাম, সেদিন থেকে দেখা গেল পরিমাপ-পদ্ধতি ও যুক্তি নির্মাণের জগতে একটা অন্তর্নিহিত অনির্ধারণবাদ (indeterminism) কাজ করছে। স্থূল ঘটনার জগতে আমাদের বিজ্ঞানবোধ অনেকটা কার্তেসিয় ধরণের ছিল – একটি লব্ধ বিজ্ঞানবোধকে বারবার ঝালাই (wielding) করে বাস্তবের কাছাকাছি আনার চেষ্টা করা হত। ব্যাশেলার একে বলবেন প্রথম শ্রেণির অনুমান (1st order approximation), কিন্তু সূক্ষ্ম ঘটনার জগতে আমাদের পরিমাপ-পদ্ধতির মধ্যেই জড়িত থাকছে এক ধরণের অপরিপূর্ণতা – যাকে বলা হবে দ্বিতীয় শ্রেণির অনুমান। ফলে ব্যাশেলার দাবি করবেন যে বাস্তব সম্পর্কে আমাদের ধারণা কেবল আপেক্ষিকভাবে যথাযথ (precise) হতে পারে, কিন্তু কখনোই চরমভাবে সঠিক (absolutely exact) হতে পারে না।[10]

ব্যাশেলারের দাবিতে এটা অন্তত পরিষ্কার হয়ে গেল যে তথাকথিত যুক্তিবাদী চিন্তাগুলি প্রদত্তও নয়, অপরিবর্তনীয়ও নয়। এর ফলে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন রকমের যুক্তি নির্মাণ, যুক্তি বিন্যাসের প্রশ্ন এসে পড়বে, প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে বিজ্ঞানের দর্শন ও বিজ্ঞানের ইতিহাসের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, অবিচ্ছেদ্যতা, বিতর্ক উঠবে ইতিহাসের দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে। Mary Tiles-এর ভাষায়[11]

“Indeed, the whole difficulty of the suggestion that the history of science has a role to play in the philosophy of science is that it requires the philosopher of science inextricably entangled with the debates in the philosophy of history.”

কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাস লিখন কেমন হওয়া উচিত – প্রচলিত ইতিহাস লিখনের ক্ষেত্রে কোনো ধরণের সঠিক-বেঠিক বিচার বা পক্ষপাতিত্বমূলক মান-নির্ণয় না করলেও চলে। কিন্তু বিজ্ঞানের ঐতিহাসিকের ‘প্রগতি’-র তরফে বিচার-বিশ্লেষণের দায়িত্ব আছে। প্রগতি যে বিজ্ঞানচর্চার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এটা বারবার প্রমাণ হয়ে গেছে – দাবি করেন ব্যাশেলার। প্রগতির প্রাসঙ্গিকতা মেনে নিলেও ব্যাশেলার বিজ্ঞানচিন্তার ঐতিহাসিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো ধারাবাহিকতাকে আবশ্যিক বলে মনে করেননি। (viii, X) 

নিজের পি.এইচডি. উপদেষ্টা লিওঁ ব্রুনস্‌উইগ-এর উৎসাহে ব্যাশেলার বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিদ্যার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলেন এবং সেই অভিজ্ঞতার নিরিখে পূর্ববর্তী অন্যান্য যুগের বিজ্ঞানচর্চার বিবর্তনের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। ব্যাশেলার দেখলেন ‘জ্ঞান’ নিজেই জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, বন্ধ করে দিতে পারে নতুন কোনো প্রশ্ন করার বা তাদের উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা। ব্যাশেলার একে বললেন “জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা”। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে সূর্যগ্রহণের সময় আকাশে বুধের দুটি পৃথক অবস্থান আপাত দৃষ্টিতে ‘সাধারণ জ্ঞান’-বিরোধী এবং তৎসহ আলো সরলরেখায় চলে এই প্রতিপাদ্যটির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। কিন্তু বিষয়টিকে বোঝার জন্য যে স্থানকালের স্বত্ততেত্ব (ontology) বর্জন করতে হবে বা ইউক্লিডিয় জ্যামিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে তা প্রথমে বোঝাই যায়নি, বরং এগুলি একপ্রকার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং তথাকথিত ‘common sense’ এই ধরণের প্রতিবন্ধকতার উদাহরণ। আরও একটি প্রতিবন্ধকতা হল সাধারণীকরণ বা Generalization। যা কিনা তত্ত্বকে অতিবিস্তৃত করার নামে প্রয়োগের শর্তগুলিকে উপেক্ষা করতে পারে, জন্ম নিতে পারে নতুন কোনো অভিজ্ঞতাকে বোঝার সীমাবদ্ধতা। ব্যাশেলার এটাও বোঝালেন – “Just as generalization can become an impediment to knowledge when it is insufficiently tested by reference to physical reality, rigorous measurement can become an epistemological obstacle when it is unjustifiably precise.” তবে জ্ঞানতত্ত্বগত প্রতিবন্ধকতার অস্তিত্ব এতটাই অনিবার্য যে এগুলি যে কোনো বিজ্ঞানচিন্তনের প্রতিটি স্তরের মধ্যে তথা গভীরতার মধ্যে অপরীক্ষিত থেকে যাবেই। ফলে (কার্তেসিয় মত অনুযায়ী) জ্ঞান নির্মাণে স্বজ্ঞানির্ভর নিশ্চয়তার অস্তিত্ব আর আশা করা যাচ্ছে না। ব্যাশেলারের মতে, পার্থিব জগৎ বিমূর্ত কারণ নির্মাণ একটি দ্বান্দ্বিক (dialectical) প্রক্রিয়া। জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা এই প্রক্রিয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া দার্শনিক হেগেলের চিন্তার সঙ্গে সমতুল্য নয়। কারণ ব্যাশেলার এক্ষেত্রে কোনো তাত্ত্বিক অপরিহার্যতা দেখছেন না, দেখছেন না কোনো ধারাবাহিকতা, বরং বলছেন জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে বিজ্ঞানচিন্তার জগতে আসে এক ধরণের অসন্ততা (epistemological break)। বিজ্ঞানের নির্মাণ নাকি আবিষ্কৃত সত্যের কোনো রৈখিক আহরণের (accumulation) ইতিহাসকে মান্যতা দেয় না। বরং কোনো এক যুগের ধারণাগত পরিকাঠামো তার পরের যুগে অনুরূপ আরেকটি পরিকাঠামো দ্বারা স্থানচ্যুত হয়। (যেমন নির্ধারণবাদী নিউটনিয় বলবিদ্যা স্থানচ্যুত হয়েছে সম্ভাবনাধর্মী কোয়ান্টাম বলবিদ্যা দ্বারা।) অনেক ক্ষেত্রে পরেরটি আগেরটির প্রয়োগের শর্তকে নির্ধারণ করে মাত্র। এক্ষেত্রে প্রয়োজন এক ধরণের বিশ্লেষণের, যা একটি প্রদত্ত বিজ্ঞানবোধের সঙ্গে পূর্বোক্ত ধারণার ঐতিহাসিক নির্মাণপ্রক্রিয়ার সম্পর্ক পরিমাপ করবে। ব্যাশেলার বললেন এটাই জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপরেখা (epistemological break)। এই রূপরেখা নির্মাণ ও নতুন আবিষ্কারের কার্যপ্রণালী কেবল এক ধরণের পরিবর্তনই আনে তা নয়, বিজ্ঞানচিন্তার গতিপ্রকৃতিতে একটি ধন্যাত্মক মূল্যমান দিয়ে থাকে – যাকে ব্যাশেলার বললেন জ্ঞানতত্ত্বগত কাজ (epistemological act)।

তবে প্রশ্ন ওঠে জ্ঞানতত্ত্বগত রূপরেখা তৈরিতে ব্যক্তি বিজ্ঞানীর ভূমিকাটি ঠিক কী? প্রথমত, জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতাগুলি সর্বদাই যে বিজ্ঞানচর্চার নিয়মানুবর্তীতাতেই কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ তা নয় – এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিজ্ঞানীর মনোজগতের অন্তর্নিহিত চরিত্র, কোনো ভাঙা ভাঙা, অসাযুজ্যপূর্ণ, এমনকী স্বপ্ননির্ধারিত অনুভূতি, যা সর্বদা কঠোর বিশ্লেষণের স্তরে উঠে আসছে না। বিজ্ঞানের জগতে শব্দের বা শব্দবন্ধের ব্যবহার, রূপকের ব্যবহার ইত্যাদিও বিজ্ঞানীর মনোজগতকে নানাভাবে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় অভ্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম পরিভাষার কথা বলবেন।)[12] তৈরি হতে পারে এক ধরণের প্রতিবন্ধকতা। ব্যাশেলার এক্ষেত্রে চিন্তার জগতে ঘটে চলা অবচেতন বা অর্ধচেতন নানা গঠনের কথা বলবেন।[13]

তবে ব্যাশেলার ব্যক্তি বিজ্ঞানীর ধারণাতেই বিজ্ঞানবোধের চরম অস্তিত্ব আছে বলে মনে করেন না। অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে এক ধরণের সহমত্যও বিজ্ঞানের ধারণা তৈরিতে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এক্ষেত্রে এমনকী ভ্রান্ত ধারণার প্রতিও সহমত্য সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। ব্যাশেলারের চিন্তায় কার্তেসিয় নিঃসঙ্গ ভাবুক (Cogito) হয়ে পড়ল সহমত পোষণকারী একদল ভাবুক (Cogitamus)-এর চিন্তার অংশীদার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য বিজ্ঞানচিন্তার ইতিহাসে ‘সত্য’ আর ‘ভুল’-কে ব্যাশেলার পরস্পরবিরোধী মনে করেন না। তিনি বলছেন –

“বিজ্ঞানের জগতে সত্যগুলি একটি সংহত ব্যবস্থার জন্ম দেয়, আর ‘মিথ্যা’ বা ‘ভুল’গুলি হারিয়ে যায় আকার-আকৃতিহীন একটা মিশ্রণে। অন্যভাবে বলতে গেলে সত্যগুলি প্রশ্নাতীত বা সন্দেহাতীতভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়, আর ভুলগুলি বিচ্ছিন্ন বিবৃতির সমষ্টি হিসাবে থেকে যায়।”

ফলে সত্য আর ভুলগুলিকে সমান মাপকাঠিতে আমরা দেখছি না।

ব্যাশেলার সংক্রান্ত আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিজ্ঞানের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক কোনো ধারণার তত্ত্বনির্ভরতা। বিজ্ঞানের তথাকথিত পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়াটি কোনো পূর্বনির্ধারিত তাত্ত্বিক ধারণার প্রতি আনুগত্য রেখেই তৈরি হয় – আমাদের যুক্তি প্রক্রিয়াকরণের মধ্যেই বস্তুজগৎ সম্বন্ধে সম্ভাব্য ও অসম্ভাব্য ধারণাগুলি নিহিত থাকে। বিষয়টিকে ব্যাশেলার বলবেন objective mediation (বা বস্তুকেন্দ্রিক মধ্যস্থতা), যা দেকার্তের ব্যক্তিকেন্দ্রিক (subjective) মধ্যস্থতার ঠিক বিপরীত। বস্তুজগতকে বোঝার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানকেন্দ্রিক ধারণাগুলিকে সাধারণ জৈব অনুভূতিলব্ধ ধারণার তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন ব্যাশেলার। গ্যারি গাটিং-এর ভাষায়, “Science replaces ordinary experiences with its own theoretically informed experience.”[14] এই প্রসঙ্গে ব্যাশেলারের “ফেনোমেনোটেকনিক” (phenomenotechnique) ধারণাটি উল্লেখ্য। তাঁর মতে বস্তুজগৎ সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রাসঙ্গিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির জন্য অনেক ক্ষেত্রে নানা ধরণের পদ্ধতিগত কারিগরি বা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা জড়িত থাকে – জড়িয়ে থাকে এক ধরণের যন্ত্রনির্ভর যুক্তি (instrumental rationality)। পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের জগতে আমরা আর সরাসরি প্রাকৃতিক প্রকৃতিকে (natural nature) নিয়ে নাড়াচাড়া করছি না, করছি কিছু প্রযুক্তিগত উপাদান নিয়ে।[15] [16]

বিজ্ঞানের দার্শনিক হিসাবে ব্যাশেলারের সামগ্রিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা মূলত কার্তেসিয় ধারণার সমালোচনার দিকটিই তুলে ধরেছি। অকার্তেসিয় দৃষ্টিভঙ্গির উৎস হিসাবে ব্যাশেলার কিন্তু তুলে ধরেছেন আরও দুটি বিষয়কে – অ-নিউটনিয় পদার্থবিদ্যা এবং অ-ইউক্লিডিয় জ্যামিতিকে। এক্ষেত্রে গণিত সম্বন্ধে ব্যাশেলারের দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। আইনস্টাইনের পদার্থবিদ্যা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ব্যাশেলার বলেছেন, বর্তমান বিজ্ঞানে গণিত আর পূর্বপ্রাপ্ত কোনো পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের ব্যাখ্যামূলক অবরোহণ (deduction) রূপে কাজ করছে না, তা কাজ করছে সংশ্লেষণাত্মক (synthetic) এবং আরোহণমূলক (inductive) দৃষ্টিভঙ্গিতে, গণিত মননেই তৈরি হচ্ছে নতুন আবিষ্কারের নির্মাণ। এমনকী বাস্তব পর্যবেক্ষণের অনেক আগেই হচ্ছে সম্ভাব্য বাস্তবের গাণিতিক রূপায়ণ, ঠিক যেমনটা হয়েছে পজিট্রন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে। মহাজাগতিক রশ্মিতে পজিট্রন পাওয়ার অনেক আগেই ডিরাক তত্ত্বে পজিট্রনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। ব্যাশেলার এটাকেই বলবেন Inductive mathematics। আজকের দিনের গাণিতিক পদার্থবিদ্যা থেকে শুরু করে Simulational physics-এর ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক বস্তুনিষ্ঠতার প্রশ্নে (scientific objectivity) জৈব অনুভূতি অপেক্ষা যন্ত্রনির্ভরতার গুরুত্ব এবং ব্যক্তি বিজ্ঞানীর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা একটি বৈজ্ঞানিক জগতের অবতারণা ব্যাশেলারের চিন্তায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে ব্যাশেলারের প্রগতির ধারণাটি আমার কাছে বেশ গোলমেলে মনে হয়। চিন্তার জগতে যদি পরিকাঠামো পরিবর্তনই বিজ্ঞানের ইতিহাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হয়, তাহলে প্রগতির কোনো ইতিহাস-নিরপেক্ষ মানদণ্ড থাকতে পারে কি? এরকমই কিছু কারণ দেখিয়ে বিজ্ঞানের জগতে চিন্তার প্রগতির ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন টমাস স্যামুয়েল কুন।[17] এখানে উল্লেখ্য যে ব্যাশেলারের আলোচনা মূলত পদার্থবিদ্যা, গণিত, গাণিতিক পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়, বিশেষত জীববিদ্যা চর্চায় বিজ্ঞানের ইতিহাস বা দর্শন কী হতে পারে তা জানার জন্য আমাদের আরও একজন ফরাসি ভাবুকের কাছে যেতে হবে। পরবর্তী সংখ্যায় সেই আলোচনার অঙ্গীকার রাখছি।


[1] G.R. Evans, Anselm and a new generation, Oxford: Clarendon Press (1980).

[2] E. Grant, God and Reason in the Middle Ages, Cambridge University Press (2004).

[3] Rene Descartes, Discourse on Method & Related Writings, Penguin Classics (2003).

[4] J. Carriero, Between Two Worlds: A reading of Descartes’s Meditation, Princeton University Press (2009).

[5] W.K.C. Guthrie, A History of Greek Philosopphy, Vol. I & II, Cambridge University Press (1980).

[6] T.W. Adorno, Metaphysics, Stanford University Press (2001).

[7] I. Hacking, Taming of Chance, Cambridge University Press (1988).

[8] M. Tiles, Bachelard: Science and Objectivity, Cambridge University Press (1984).

[9]  D. Lecourf, L’ Epistemologic historique de Gaston Bachelard (1969).

[10]  R.C. Smith, Gaston Bachelard: Philosophers of Science& Imagination, State University of New York (Albany) (2016).

[11] H. Marcuse, Reason and Revolution (Hegel & the rise of social theory), Routledge & Kegan Paul LTD. (1955).

[12] W. Heisenberg, Physics and Philosophy, Penguin Books (1989).

[13] G. Bachelard, The Formation of Scientific Mind, Clinamen Press (2002).

[14] G. Gutting, Michel Foucault’s Archaeology of Scientific Reason, Cambridge University Press (1989).

[15] T. Castelao-Lawless, Philosophy of Science, Vol. 62, No. 1, Mar. 1995 (44-59).

[16] C. Chimisso, Stud. Hist. Phil. Sci., Vol. 39 (2008) (384-392).

[17] T. Nickles, Thomas Kuhn, Cambridge University Press (1989).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *