খসড়া ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বিজ্ঞপ্তি ২০২০’: একটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ

environment pollution

আশিস কুমার দাস

বাধাহীন মুনাফা আর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়ার সমস্ত বন্দোবস্তই খসড়া ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বিজ্ঞপ্তি ২০২০’[1] (Environment  Impact  Assessment  Notification, 2020) পাকাপোক্ত ভাবে গুছিয়ে হাজির করেছে। এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে পরিবেশ আর মানুষের জন্য ধ্বংসের পরোয়ানা। কেন্দ্রীয় সরকার এখন আরও খোলাখুলি ভাবে ব্যবসায়ী আর শিল্প-মালিকদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সফল হলে, কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগ অর্থ-লগ্নিকারীদের অবাধ আর অনায়াস লুণ্ঠনে ‘গতি’ আনতে এক আইনি ঢাল হিসাবে আরও স্বচ্ছন্দে কাজ করবে কোনো সন্দেহ নেই। মোদী-সরকারের সামনে দুটিই লক্ষ্য: অবাধ ও বেপরোয়া মুনাফার সামনে সমস্ত বাধা সরিয়ে দাও; সাধারণ মানুষের প্রশ্ন করার এবং প্রতিবাদ করার সমস্ত উপায় বন্ধ করে দাও। আইনকানুনও সে-ভাবেই সেজে উঠছে। সেজন্য এমনকী এখনকার ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’-এ (Environment  Impact  Assessment  Notification, 2006) যতটুকু  পরিবেশের রক্ষাকবচ আছে, সেগুলিকেও হয় সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বা আরও দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। সবসমেত ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’কেই প্রতিস্থাপিত করে জারি হতে চলেছে সম্পূর্ণ নতুন এক মুনাফা-বান্ধব নীতি।

খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’-র শুরুতেই বলা হয়েছে “উন্নয়ন প্রকল্পগুলির উপর কিছু নিয়ন্ত্রণ এবং বাধা আরোপ করা” এবং “প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ এবং দ্রুত” করাই নাকি উদ্দেশ্য। সেই হিসাবে গোটা প্রক্রিয়াটিকে সাজানো হয়েছে প্রকল্প-প্রস্তাবকারীদের অনুকূলে, তাদের সমস্ত বেনিয়মের ঘটনাগুলিকে সাধারণ নাগরিকদের নজরদারির আওতা থেকে সযত্নে সরিয়ে রেখে।[2]  খসড়াটি আইনসিদ্ধ হলে অনেক কিছুই বদলে যাবে এটা যেমন ঠিক, তেমনই এটাও ঠিক, এখনও পর্যন্ত সমস্ত প্রকল্পগুলিই চলছে ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’-এর বেঁধে দেওয়া নিয়মে, তার সমস্ত সংশোধনীগুলি সহই। তবে তার মানে এই নয় যে এখনও যা কিছু চলছে, সব কিছুই ঠিকঠাক চলছে। বরং বলা যায়, চলছে বেনিয়মের ছন্দেই, বাঁকা চলনে। খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’ এই বেনিয়মগুলিকেই তীক্ষ্ণ করে আইনসঙ্গত করে তুলতে চাইছে।

‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’-এ অনেক অস্পষ্টতা আছে সে-ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ব্যবহার করা বিভিন্ন আইনি শব্দ বা শব্দবন্ধগুলির কোনো সুনির্দিষ্ট ভাবে সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা এখানে নেই। এ-রকম নানান অস্পষ্টতার ফাঁকগুলিকে কাজে লাগিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রকল্পে অর্থ-লগ্নিকারীদের সুবিধামতো একের পর এক সংশোধনী হয়েছে প্রকল্প-প্রস্তাবকারীদেরই স্বার্থে। যত বার সংশোধন হয়েছে, তারা সরকারকে, পরিবেশ মন্ত্রককে সাধুবাদ জানিয়েছে, তা সে যে দলই ক্ষমতাসীন হোক না কেন। ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’-এ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেই আক্রমণগুলিকে সংহত চেহারা দেওয়ার উদ্দেশ্যে খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’-তে সুনির্দিষ্ট ভাবে ৬০টি সংজ্ঞা রাখা হয়েছে (পৃ: ২-৮)। সংজ্ঞায়ন স্পষ্ট, আক্রমণ আরও স্পষ্ট, এবং খোলাখুলি।

ধারাবাহিকআত্মনির্ভরতা’— যাক, যা আছেতা যাক!

নিশ্চয়ই মনে পড়বে যে এই ভয়াল করোনা আবহেই দেশের প্রধানমন্ত্রী ১১ জুন ২০২০-তে “আত্মনির্ভর ভারত” গড়ে তোলার লক্ষ্যে সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন, “এই করোনা-কালেই সঙ্কটকে পরিণত করতে হবে সুযোগে”![3] তা তিনি যে যথেষ্ট কুশলতার সঙ্গে করে চলেছেন সেটা আমরা বেশ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারি, আর সেটা বোঝা আমাদের আরও সহজ হয়ে যাবে যত তাড়াতাড়ি আমরা এপ্রিল ২০১৯-এ তারই দক্ষিণহস্ত এনআরসি লাগু করা সম্পর্কে ভয়ঙ্কর আত্মবিশ্বাসী অমিত শা-জির “আপ ক্রনোলজি সমঝ লিজিয়ে”[4] এই বাক্যবন্ধটিকে তাদের ধারাবাহিক কার্যকলাপের সারিতে সাম্প্রতিক এই খসড়া বিজ্ঞপ্তিকে ফেলে বোঝার প্রয়াস নেব।

পরিবেশ ও মানুষের সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’ আসলে হয়ে দাঁড়াচ্ছে অর্থ-লগ্নিকারীদের অবাধ লুঠের সুরক্ষা দেওয়ার হাতিয়ার। পরিবেশ সুরক্ষার আইনগুলিকে আরও দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত জনসম্প্রদায়গুলির প্রতিবাদকে আইনি পথে চুপ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। 

প্রতিবাদ ও সরকারি প্রতিক্রিয়া

খসড়া বিজ্ঞপ্তিটি সরকার প্রকাশ করার পর থেকেই বিভিন্ন মহল প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। আর তার প্রতিক্রিয়ায় শাসকদের পক্ষ থেকে নানা ভাবেই চেষ্টা চালানো হচ্ছে যাতে প্রতিবাদগুলি কোনো ভাবেই সংগঠিত চেহারা না নিতে পারে। সরাসরি পরিবেশ-সুরক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্র-সংগঠন সহ বেশ কিছু সংগঠন ও ব্যক্তিত্ব, এরাই মূলত এখনও এই প্রতিবাদে সক্রিয় ভাবে সামিল। সমাজের অন্যান্য অংশের সংবেদনশীল ও সচেতন মানুষ যারা শাসকদের প্রতিটি কার্যকলাপের দিকে সতর্ক নজর রাখেন, সেগুলিকে সযত্নে অধ্যয়ন করেন, প্রকাশ্য ও সুচতুর ভাবে আড়াল করে রাখা প্রতিটি জনবিরোধী আক্রমণকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস ধরেন, তারা যাতে সরকারের দিকে সমালোচনার আঙুল না তুলতে পারে সে-জন্য কোনো বেপরোয়া পদক্ষেপ নিতেও এই সরকার কসুর করছে না। ভারতের শান্তি ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে ওঠার মিথ্যা অভিযোগে[5] কত অনায়াসেই না অপ্রাসঙ্গিক আইনগুলিকে এই প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হচ্ছে! শাসক ও তাদের পৃষ্ঠপোষকরা কখনো কখনো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে এমন কথা বলে যা আসলে সত্যি ও ন্যায়সঙ্গত![6] রাজস্থানের ১৯ জন বিদ্রোহী কংগ্রেস বিধায়ক সংক্রান্ত এক মামলায় শীর্ষ আদালতের বিচারপতি অরুণ মিশ্র এই সম্প্রতি ২০২০-র ২৩ জুলাই বলেছেন “গণতন্ত্রে বিক্ষুব্ধ কণ্ঠকে রোধ করা যায় না।” কিন্তু সেটাই করা হচ্ছে একটা ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে।

কয়েক লক্ষ প্রতিবাদ-পরামর্শ-সমালোচনা যদি মেলবক্সে হাজির হয়, প্রথমে বিরক্ত, তার পর আতঙ্কিত হওয়ারই কথা। পরিবেশ-মন্ত্রীও সে-কারণেই স্বস্তিতে নেই। খসড়া বিজ্ঞপ্তিতে যে-ভাবে পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকার উপর সংগঠিত ভাবে আঘাত হানার পরিকল্পনা করা হয়েছে, বিষয়টির গম্ভীরতার দিক থেকে বিচার করলে সে-তুলনায় এই কয়েক লক্ষ খুবই সামান্য ঠিকই, কিন্তু অতিমারির এই আবহে এত অল্প সময়ের পরিসরে এই প্রাথমিক প্রতিবাদ মোটেই গুরুত্বহীন নয়। হোক না তা অসম্পূর্ণ বা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। উদ্বেগ আর বিপন্নতা থেকে জন্ম নেওয়া এ প্রতিবাদ যথার্থ। কারণ অভূতপূর্ব এক আক্রমণ মোকাবেলা করার তাগিদ বড় বেশি করে এখন সামনে চলে এসেছে। বরং বলা যায়, এই সরাসরি ও স্পষ্ট আক্রমণ মানুষের ফুঁসে ওঠা ক্ষোভ ক্রমশ দানা বেঁধে ওঠার, বিনা যুদ্ধে না মেনে নেওয়ার, মরার আগে না মরতে চাওয়ার একটা প্রাথমিক প্রচেষ্টা আর নতুন ভাবে ভাবনাচিন্তা করার সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল আমাদের সামনে।   

সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে!

পরিবেশ ও মানুষের সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’ আসলে হয়ে দাঁড়াচ্ছে অর্থ-লগ্নিকারীদের অবাধ লুঠের সুরক্ষা দেওয়ার হাতিয়ার। পরিবেশ সুরক্ষার আইনগুলিকে আরও দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত জনসম্প্রদায়গুলির প্রতিবাদকে আইনি পথে চুপ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। উন্নয়নের নামে বিকাশ ও পরিবেশের ভারসাম্যকে উপেক্ষা করে খোলাখুলি শিল্প-মালিক ও অর্থ-লগ্নিকারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। পরিবেশ সুরক্ষা আইন ১৯৮৬-র (Environment (Protection) Act, 1986) ঘোষিত লক্ষ্য ছিল “পরিবেশের সুরক্ষা এবং উন্নতি এবং মানুষ, অন্যান্য প্রাণী, গাছপালা ও সম্পদের ক্ষতি রোধ করা”।[7] সেই লক্ষ্য থেকে আমরা এখন অনেক দূরে সরে এসেছি। এই আইনের অধীনে, ১৯৯৪ সাল থেকেই ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন’ এমন একটি পরিচালন হাতিয়ার (Mangement tool) যা যথাযথ পরীক্ষা না করে পরিবেশ ও স্থানীয় জনসম্প্রদায়গুলির পক্ষে ভয়ংকর বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে এমন কোনো শিল্পীয় বা কাঠামোগত প্রকল্পকে ছাড়পত্র দেবে না, প্রয়োজনে আটকে দেবে। আর যে-সব প্রকল্পগুলিকে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অবশ্যই যেতে হবে সেগুলি হল যেমন, বাঁধ, কয়লা বা অন্যান্য খনি, কাঠামোগত উন্নয়ন, তাপ, পরমাণু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, নির্মাণ ও শিল্পীয় প্রকল্প ইত্যাদি। এই সব প্রকল্প চালু হলে পরিবেশ ও মানুষের উপর তার কী সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে তা পরীক্ষানিরীক্ষা করে আলোচনার মধ্যে দিয়ে স্থির হওয়ার কথা। তারপর আসে ছাড়পত্র দেওয়ার প্রশ্ন। হ্যাঁ, প্রক্রিয়াটি কিছু দীর্ঘ, সময়সাপেক্ষ। কিন্তু এ-সব ভেবেই আইন তৈরি হয়েছে। কারণ, মানুষ আর প্রাণীজগৎকে ঘিরেই তো পরিবেশ। আর পরিবেশ না বাঁচলে আমরা কেউই বাঁচব না! একবার কোনো ক্ষতিকর প্রকল্প ছাড়পত্র পেয়ে গেলে তা পরিবেশ ও মানুষের এমন কিছু ক্ষতি করে ফেলতে পারে যা আর কোনো দিন ফিরে পাওয়া যাবে না।

কিন্তু এ-সব তো আদর্শগত কথা। বাস্তবে সব সময়েই ক্ষমতাসীন সরকারগুলি সুকৌশলে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কী-ভাবে আইনকে পাশ কাটিয়ে, সাধারণ মানুষের আবশ্যিক ও বাধ্যতামূলক সম্মতিকে এড়িয়ে, ছলে-বলে তাদের অধিকার কেড়ে নিয়ে অর্থ-লগ্নিকারীদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়া যায়। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ক্ষমতাসীন বিজেপি-জোট সরকার ঠিক এই কাজটিতে যথেষ্ট মুনশিয়ানা দেখিয়েছে। যার সেরা ও মারাত্মক উদাহরণ খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’।

বর্গ বিভাজনের কেরামতি

কোনো শিল্প স্থাপন করতে গেলে কাজ শুরু করার আগেই ‘আগাম ছাড়পত্র’ (Prior Environment Clearence, অথবা Prior Environment Permission) নিতে হয়। নয়া বিজ্ঞপ্তিতে পরিবেশের পক্ষে বেশ কিছু স্পর্শকাতর প্রকল্পকে আর ছাড়পত্র নিতে হবে না। খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’-র ২৬ ধারায় (পৃ: ৩৩-৩৬) ৪০ ধরনের প্রকল্পকে কোনো ‘আগাম পরিবেশ ছাড়পত্র’ বা ‘আগাম পরিবেশ অনুমতি’ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, পরিবেশ সুরক্ষাবলয় ভাঙার দায়ে তাদের আর অভিযুক্তও করারও প্রশ্ন নেই! আবার কেউ যদি আইন ভঙ্গও করে, তাদেরও স্বার্থে যাতে তেমন ঘা না লাগে, তার ব্যবস্থাও এখানে নানা ভাবে করে দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রকল্পগুলির সঠিক বর্গ-বিভাজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘হযবরল’-র নিয়মকে উলটে দিয়ে ‘উন্নয়ন’-এর নামে সবই হয়ে যায় “ছিল ‘বিড়াল’, হয়ে গেল ‘রুমাল’”! শুরুতেই খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’-র ক্ষেত্রে সেটা করা হয়েছে চালাকির মোচড় দিয়ে — কখনো প্রকল্পের বর্গের (Category) ধাপ নামিয়ে, বা কখনো প্রকল্পগুলির আয়তন ও ক্ষমতার হেরফের করে, কখনো একই বর্গে রেখে সংখ্যাগত মানের অদলবদল ঘটিয়ে।[8] ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’-এ যে প্রকল্পগুলি ‘ক’ বর্গে আছে, সেগুলিকে ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’-এ আয়তন বা ক্ষমতার দিক থেকে একই থাকা সত্ত্বেও এক ধাক্কায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে কড়াকড়ির দিক থেকে অপেক্ষাকৃত শিথিল ও সহজ ‘খ’ বর্গে। আর ‘ক’ বর্গে রাখা হয়েছে আরও বড় ও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন সেই একই প্রকল্পগুলিকে। যেমন দেখা যাক, ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’-এ নদী-উপত্যকায় ৫০ মেগাওয়াট বা তার বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎ শক্তি প্রকল্প আছে ‘ক’ বর্গে। খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’তে ৭৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত এই প্রকল্পগুলিকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘খ’ বর্গে। ‘খ-২’ বর্গে রাখা হয়েছে ২৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত প্রকল্পগুলি। ‘ক’ বর্গে রাখা হয়েছে ৭৫ মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকল্পগুলিকে। একই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে সেচ প্রকল্পের মতো বেশ কিছু প্রকল্পের ক্ষেত্রেও।

প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে ‘ছাড়পত্র’ পাওয়ার প্রক্রিয়া সাধারণত অনেক দীর্ঘ। শুরু করতে গেলে অনেকগুলি ধাপ এই প্রকল্পগুলিকে পেরতে হয়। ‘বিজ্ঞপ্তি ১৯৯৪’কে প্রতিস্থাপিত করে ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’ প্রস্তাবিত প্রকল্পকে সবুজ সংকেত দেওয়ার প্রক্রিয়ার চারটি ধাপ ঠিক করে — ‘বাছাই’, পরিবেশ বাঁচিয়ে কাজ করার ‘শর্ত-নির্ধারণ’, স্থানীয় জনসম্প্রদায়গুলির সঙ্গে আলোচনা ও জনশুনানি বা ‘জন-পরামর্শ’ এবং ‘নির্ধারক বিশেষজ্ঞ কমিটি’র রায়। কোনো প্রকল্প শুরু, সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণের ফলে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের উপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে কি না, বা পড়লেও সেটা ঠিক কতখানি বিচার করে কোনো প্রকল্পের বর্গ ঠিক করার জন্যই শুরুতে এ-জন্য ‘বাছাই’য়ের (‘Screening’ বিজ্ঞপ্তি ২০০৬, পৃ: ৪) ধাপ।

‘ক’ বর্গের (Category-A) এই ‘বাছাই’টা করে সরকারেরই ঠিক করে দেওয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা কমিটি, তা সে কেন্দ্রীয় স্তরেই হোক বা রাজ্য স্তরেই হোক। বিভিন্ন প্রকল্পগুলিকে ২০০৬ এবং ২০২০-র দুটি বিজ্ঞপ্তিতেই ‘ক’ ও ‘খ’ বর্গে ভাগ করা হলেও, ২০০৬-এর বিজ্ঞপ্তিতে ‘ক’ বর্গে কী কী প্রকল্প আছে তা স্পষ্ট, কিন্তু ‘খ-১’ ও ‘খ-২’ বর্গে বিভাজন স্পষ্ট করা হয়নি। এ-ব্যাপারটা, অর্থাৎ প্রকল্প ‘বাছাই’ (‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’, পৃ: ৪) করার মাপকাঠি ঠিক করার ব্যাপারটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সময়ান্তরে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ মন্ত্রকের উপর। আর বর্তমান পরিবেশ মন্ত্রক খসড়ায় সম্পূর্ণ নতুন ভাবে প্রকল্পগুলির বর্গ-বিভাজন করে পুরো বাছাই-পর্বটিই তুলে দিচ্ছে পরিবেশ সংক্রান্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই। ফলে পরিবেশ ও মানুষের পক্ষে ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে গোড়া থেকেই। যে-প্রকল্পগুলিকে আগে থেকেই আমরা পরিবেশ ও মানুষের পক্ষে সম্ভাব্য ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে জানি, সেগুলিকে আর ততটা ক্ষতির কারণ বলে মনে করা হচ্ছে না এই খসড়া বিজ্ঞপ্তিতে, আর কেন তা করা হচ্ছে না তারও কোনো ব্যাখ্যা বা সাফাই এই খসড়া বিজ্ঞপ্তি দেয়নি।

‘খ-১’ ও ‘খ-২’ বর্গের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়ার কঠোরতা তুলনামূলক ভাবে ধাপে ধাপে কম। এই ‘খ-২’ বর্গে নিয়ে আসা প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে জনশুনানির কোনো ব্যবস্থাই খসড়ায় রাখা হয়নি। ফলে অনেক সহজেই সম্ভাব্য ক্ষতির কারণ প্রকল্পগুলি কোনো “আগাম পরিবেশ অনুমতি” (Prior Environment Permission বা EP) পেয়ে যাবে। কোনো মূল্যায়ন ছাড়াই বেশ কিছু প্রকল্প শুধু সেই ‘অনুমতি’র উপর ভিত্তি করেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার অধিকারী হয়ে যাবে।

খসড়া বিজ্ঞপ্তিতে কোনো কোনো প্রকল্পকে আবার এখনকার ‘ক’ বর্গ থেকে সরিয়ে এনে ‘খ-২’ বর্গে নিয়ে আসা হয়েছে। যেমন, তরলীভূত প্রাকৃতিক গ্যাসকে (LNG) ‘ক’ বর্গ থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে ‘খ-২’ বর্গে। একই ভাবে আবার এখনকার ‘ক’ বর্গ থেকে ‘খ-১’ ও ‘খ-২’ বর্গে সরিয়ে আনা হয়েছে অনেক সেচ প্রকল্প, ধাতু কারখানা, রোপওয়ে-কে। সেগুলির ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেওয়ার আগের পরীক্ষানিরীক্ষা ও পরবর্তী নজরদারির ধাপগুলিকেও কমিয়ে আনা হয়েছে বা নিতান্ত আনুষ্ঠানিক করে ফেলা হয়েছে। ফলে যে-সমস্ত প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়ার আগে নানান দিক থেকে তথ্য সংগ্রহ করা দরকার, তা না করে সাদামাটা ভাবে এখন তথ্য সংগ্রহ করা হবে। আর তার ফলে সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কাও বেড়ে যাবে শুধু তাই নয়, পরিবেশের পক্ষে বিপদ মোকাবিলার প্রস্তুতিতেও মারাত্মক খামতি থেকে যাবে। অর্থাৎ, শিল্প গড়া ও কাঠামোগত সংস্কারের নামে শাসকদের স্বার্থের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবেশগত সুরক্ষাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক প্রকল্প গড়ে তুলবে, মুনাফা করবে। আর তা তাদের করতে দেওয়া হবে কোনো রকম ‘আগাম ছাড়পত্র’ ছাড়াই।

প্রকল্পগুলির ফলে পরিবেশের উপর যদি কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তা কী হল, কতটুকু হল তা স্থির করে দেবে সেই শাসকদেরই বাছাই করা এক ঝাঁক পছন্দের বিশেষজ্ঞ। স্থানীয় যে-সব জন-সম্প্রদায় প্রকৃতপক্ষে  ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরা ঠিক করে নেওয়ার কার্যত কোনো অধিকারই পাবেন না, ব্রাত্যই থেকে যাবেন। কাগজে-কলমে যতটুকু অধিকার তাদের দেওয়া হবে, তাও সরকারি দুর্বোধ্য প্রক্রিয়ার ভুলভুলাইয়ায় হারিয়ে যাবে। ক্রমশ আরও নড়বড়ে হতে থাকা পরিবেশ ও বাস্তু-সংস্থানের ভারসাম্য এবং জনসম্প্রদায়গুলির কোনঠাসা অবস্থা বিচার করে বিপুলায়তনের যে প্রকল্পগুলির ওপর কড়াকড়ি আরও বাড়ানো দরকার ছিল, বর্গের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার ফলে সেই প্রকল্পগুলির ওপর শর্তের কড়াকড়ি শিথিল হয়ে যাবে শুধু তাই নয়, এগুলি শুরু হওয়া এবং পরে আরও সম্প্রসারণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত জন-সম্প্রদায়গুলির অভিযোগ জানানো ও সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার স্বীকৃত আইনি পরিসর ও সুযোগ ভীষণ ভাবে সংকুচিত হয়ে যাবে, আইন-মোতাবেক অপ্রয়োজনীয়ও হয়ে যাবে। যা এক অশনি-সংকেত!

কেন্দ্রীয় সরকারের আস্তিনের ভাঁজে ভাঁজে কী কী চাল লুকনো আছে তা বুঝতে গিয়ে নানা পদক্ষেপ এবং নিম্ন থেকে এমনকী শীর্ষ আদালতের রায়গুলির অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সঙ্গত কারণেই আশান্বিত হওয়ার বদলে আশঙ্কিতই বেশি হই।

কার্যোত্তর ছাড়পত্রআইন ভাঙলে বাহবা পাবে!

খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’র সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি (২২ ধারা-র ১৩ উপধারা) হল ‘কার্যোত্তর ছাড়পত্র’ (post-facto clearance), যা কার্যত এখনকার ‘পরিবেশ (সুরক্ষা) আইন ১৯৮৬’-কেই অমান্য করেই তৈরি করা হয়েছে। ‘কার্যোত্তর ছাড়পত্র’র অর্থ, কোনো প্রকল্প আইন ভেঙে ‘আগাম পরিবেশ ছাড়পত্র’ ছাড়াই কাজ (নতুন, বা সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণ) শুরু করলেও ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হবে। যদিও আমরা জানি, এ-বছরই ১ এপ্রিল শীর্ষ আদালত একটি মামলায় রায় দিয়েছে “কোনো কার্যোত্তর ছাড়পত্র পরিবেশ সংক্রান্ত আইনি-ব্যবস্থার মৌলিক নীতিগুলিকে খর্ব করে, এবং এ হল ১৯৯৪-র ২৭ জানুয়ারির পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বিজ্ঞপ্তির পক্ষে একটা অভিশাপ। এটি সাধারণ স্বার্থ সম্পর্কিত রায় অনুযায়ী পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর এবং অপূরণীয় হানির কারণ হয়ে উঠতে পারে”।[9]

কিন্তু তাতে কী? ‘কার্যোত্তর ছাড়পত্র’ তো নতুন কিছু নয়।[10] ২০১৭ সালের মার্চে এ-বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রক একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। আর বর্তমান ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’-র অধীনেই প্রকল্পগুলিকে ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে সরকারের কার্যকলাপে বা অন্যান্য কোর্টের রায়ে এই অভ্যাস প্রতিফলিত। এই সরকার আসার আগেই, এমনকি ২০১৪ সালেরও আগে থেকে ওই অভ্যাসবশত ধরেই নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে যে প্রচুর পুঁজি লগ্নি করে প্রকল্পগুলিতে যদি এমনকী বে-আইনি কার্যকলাপ কিছু হয়েও থাকে, যেমন ধরা যাক, বড় বড় শপিং মল তৈরি, খনি, শিল্প-কারখানা ইত্যাদি, সেটা হয়ে গেছে ‘অজ্ঞতা’বশত। এ-সব কিছুর পেছনে আসলে দেশের জন্য ভালো করার উদ্দেশ্যই কাজ করেছে। সরকারগুলিও মনে করেছে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে ‘মসৃণ ভাবে ব্যাবসা করা’য় বাধা তৈরি করা হবে। আর কোর্টের কাছে প্রকল্পগুলির বে-আইনি কার্যকলাপ ন্যায্যতা পেয়ে গেছে বার বার ‘উন্নয়ন এবং পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য’ বজায় রাখার ক্ষেত্রে ‘উন্নয়ন’কে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখে। আমাদের এটাই দুর্ভাগ্য যে পরিবেশ ধ্বংস ও পরিবেশের আইন ভাঙাকেও দেখা হয় উন্নয়ন হিসেবে!

এখন অনেক প্রতিকূল নজির থাকা সত্ত্বেও পরিবেশ মন্ত্রক ‘কার্যোত্তর ছাড়পত্র’-র পক্ষে দুটি হাতিয়ারকে ঢাল হিসাবে সামনে রাখছে। একটি হল তার নিজেরই ২০১৭-র ১৪ মার্চ-এর বিজ্ঞপ্তি।[11] এ-রকমই আরেকটি বিজ্ঞপ্তি পরিবেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জারি করা হয় ২০১৮ সালের ৮ মার্চ।[12] আরেকটি হল ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের একটি আদেশ (বিজ্ঞপ্তি ২০২০, পৃ: ২)। যেখানে ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর একটি মামলায় আইন ভাঙা সত্ত্বেও প্রকল্পকে ‘কার্যোত্তর ছাড়পত্র’ দেওয়ার পক্ষে আদালত দাঁড়ায় সেই প্রকল্পটির যোগ্যতাকে বিচার করে। সে যাই হোক, আইনভঙ্গকারী প্রকল্প-প্রস্তাবকারীদের ছাড়পত্র দেওয়ার বদভ্যাসটা কিন্তু চালু হয় ১৯৯৮ সালে, প্রথম বিজেপি সরকারের আমল থেকেই!

শিল্পায়নই হোক বা উন্নয়নই হোক, ‘কার্যোত্তর ছাড়পত্র’ নীতি  সামনে রেখে দেশের বিকাশের পরিকল্পনা সাজালে তার পরিণতি কী ভয়াল হতে পারে তার টাটকা উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। সাম্প্রতিক এলজি পলিমার গ্যাস-লিক দুর্ঘটনা। স্মৃতির সরণি বেয়ে আমাদের খুব বেশি পেছনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

দক্ষিণ কোরীয় বহুজাতিক এলজি পলিমার-এর বিশাখাপত্তনম কারখানার ভয়াল গ্যাস দুর্ঘটনা[13] এই সে-দিনের কথা, এ-বছরেরই গত ৭ মে-র ভোরবেলা বিষাক্ত স্টাইরিন গ্যাস বেরিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কারখানাকে ঘিরে প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা গ্রামের লোক। কয়েক হাজার মানুষকে সেই মুহূর্তে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও কমপক্ষে ১২ জন মানুষ মারা যায়। মারা যায় এলাকার বহু জীবজন্তু—গরু, মোষ, কুকুর। আশপাশের গাছপালার পাতার রঙ বিবর্ণ হয়ে যায়। পানীয় জল, ফসল, শাকসবজি, জমির কত ক্ষতি হল তার হিসাব করা এখনও বাকি। আশঙ্কা থেকে যায়, যে-কয়েকশো মানুষ শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভরতি হল, ছাড়া পেলেও বহু দিন তাদের নানান উপসর্গ নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। ২০১৭ সাল থেকে এলজি পলিমার কাজ শুরু করে। কিন্তু কোনো পরিবেশ ছাড়পত্র ছিল না, ছিল না উপযুক্ত কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থাও। আর এটা বে-আইনি কাজ হলেও তা দেখার মতো সরকারি কোনো নজরদারিও ছিল না। যেদিন দুর্ঘটনা ঘটে, সেদিন এমনকী এলাকাবাসীদের সতর্ক করার জন্য সাইরেনও বাজেনি! সেটি আদৌ কাজ করে কি না তাও জানা নেই। কারণ ২০১৭ সালের পর থেকে গ্রামবাসীরা কোনো পরীক্ষামূলক সাইরেনের আওয়াজই শোনেনি। লিক বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব হলেও, বাতাসে স্টাইরিনের বিষাক্ত গন্ধ থেকে যায়। মৃত্যুর গন্ধ! অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের বানানো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির (The high power committee (HPC) রিপোর্ট[14] কোম্পানির দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই মূলত দায়ী করে।

উপেক্ষিত দেশের নাগরিকচুপ, প্রকল্প চলছে!

খসড়া বিজ্ঞপ্তিতে নীতির পরিবর্তন ও বিরোধ-মীমাংসার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত-গ্রহণ প্রক্রিয়াটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে যথাসম্ভব জনসাধারণকে বাইরে রেখে। জনশুনানির বিষয়টি রাখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার পরিধি ও সুযোগকে এমন ভাবে সঙ্কুচিত করে দেওয়া হয়েছে যাতে খুব সহজেই এবং সম্পূর্ণ আইনসঙ্গত ভাবেই জনশুনানিকে এড়িয়ে যাওয়া যায়, দুর্বল করে দেওয়া যায়। খসড়া বিজ্ঞপ্তিতে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার শুরুর প্রক্রিয়ায় জনশুনানির নোটিশ-এর মেয়াদ ৩০ দিন থেকে কমিয়ে ২০ দিন করা হয়েছে। যাদের অধিকার, জীবন-জীবিকা আর স্বাস্থ্য-র নিরাপত্তা প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত, তাদের মতামতের কোনো পরোয়া না করেই এভাবে সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত স্থানীয়দের অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করা হয়েছে। নাকচ করা হয়েছে সেচ, জাতীয় সড়ক তৈরি ও সম্প্রসারণ, রোপওয়ে নির্মাণ, বহুতল-নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির রূপায়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগ্রহণে নাগরিকদের, বিশেষ করে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত জনসম্প্রদায়গুলির মতামত ও জনশুনানিতে অংশগ্রহণ।

তরল তথ্য ও জনশুনানি

‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন’ বিশেষ করে খনি, সেচের জন্য নদী-বাঁধ, শিল্প-প্রকল্প বা বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি প্রকল্পগুলির কাজের ফলে পরিবেশের ওপর প্রভাব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষানিরীক্ষা করবে, তার পর প্রকল্পগুলিকে ছাড়পত্র দেবে এটাই আইনের ব্যবস্থা। কিন্তু প্রকল্পগুলির জন্য পরিবেশগত মূল্যায়নের সংস্থান আছে এক-একটি নির্দিষ্ট প্রকল্প-ভিত্তিক। যেটা চূড়ান্ত হাস্যকর শুধু নয়, অবৈজ্ঞানিকও বটে! এখনকার দিনের প্রকল্পগুলির আয়তন ও ব্যাপ্তিকে হিসাবে ধরলে, যদি এটা ধরেও নেওয়া যায় কোনো একটি প্রকল্প পরিবেশ-সুরক্ষা সংক্রান্ত সমস্ত রকম নিয়ম মেনেই হয়েছে, একই সঙ্গে বা পরবর্তী বছরগুলিতে এ-রকমই অন্যান্য প্রকল্পগুলির সম্মিলিত প্রভাব পরিবেশ ভারসাম্যকে চুরমার করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

আইন-মোতাবেক আরও ব্যবস্থা আছে এই ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনসাধারণ বা যে-কোন আগ্রহী নাগরিক প্রকল্প-প্রস্তাবকারীর দেওয়া রিপোর্টের উপরে মতামত দিতে পারে, আপত্তিও জানাতে পারে। যে সুনির্দিষ্ট তথ্যের উপর ভিত্তি করে কোনো প্রকল্পকে পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া বা না-দেওয়া যেতে পারে, সেই তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও আলোচনার গুরুত্বকে খসড়াটিতে আরও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক প্রকল্পকেই পরীক্ষানিরীক্ষার আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বা সীমায়িত করে দেওয়া হয়েছে। চালু প্রকল্পগুলিকে বছরে দু-বার প্রতিপালন প্রতিবেদন (Compliance Report) দিতে হয়। এখন সেটা হতে চলেছে বছরে এক বার। যার ফলে ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন’-এ প্রকল্পগুলির কার্যকলাপের ফলে পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়ছে তা পরীক্ষা করা ও নজরদারি আরও শিথিল হয়ে যাবে। এমনিতেই কোন কোন প্রকল্পকে ছাড়পত্র দেওয়া যেতে পারে সে-সম্পর্কে যথেষ্ট ও উচ্চ মানের তথ্য পাওয়া অসম্ভব। কারণ কোনো প্রকল্পে পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়ার বা না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন’-এর উপর নির্ভর করে। আর এটা তৈরি করে স্বয়ং প্রকল্প-প্রস্তাবকারীর (Project Proponent) টাকায় নিয়োজিত পরামর্শদাতারাই (Consultant)!

কেউ কিন্তু নিজের ছাল নিজে ছাড়ায় না। এমন কোনো ‘প্রতিবেদন’ কী দেখা যাবে যেখানে প্রকল্প-প্রস্তাবকারী তার রিপোর্টে নিজেই স্বীকার করছে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাস্তু-সংস্থান দারুণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে? কে না জানে এ-সব ক্ষেত্রে প্রচুর টাকার হাতবদল হওয়ার সুযোগ আছে, এবং তা অনায়াসে হয়, ভাগবাটোয়ারাও হয় উপর থেকে নিচ পর্যন্ত। ফলে বেশির ভাগ ‘প্রতিবেদন’-এই পরিবেশগত প্রভাবের সঠিক চিত্রটির প্রতিফলন হয় না, হওয়া সম্ভবও নয়। এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে বর্তমান আইনে বা আইন প্রয়োগের হাতিয়ারগুলিতে সঠিক মূল্যায়ন হওয়ার বা করার বাস্তব শর্তটিই অনুপস্থিত।

তথ্যের গুরুতর ফাঁক থেকে যাওয়াটা ফলে ধারাবাহিক ভাবে শুধু সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়াই দুর্বল করে না, সীমাবদ্ধ ও পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া ছাড়পত্র ভঙ্গুর বাস্তু-ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক বাস্তু-ভারসাম্যকে অপূরণীয় ভাবে বিপর্যস্ত করার ক্ষমতা রাখে।

খসড়ায় বেশির ভাগ প্রকল্পগুলিকে শুরু করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে কেবল প্রাথমিক তথ্য-পরিসংখ্যানের (Baseline Data) উপর, তাও আবার শুধু একটি মরশুমের জন্য, “যে-কোনো সময়ের জন্য, প্রয়োগ যখনই হোক না কেন”। এমনকী তা তিন বছরের পুরনো তথ্যও হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল,  বর্ষার মরশুম সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে প্রকল্পগুলিকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। যা একেবারেই অবৈজ্ঞানিক। তথ্য সংগ্রহের এই ব্যবস্থা পরিবেশের উপর প্রকল্পের প্রকৃত অর্থে সম্ভাব্য প্রভাবকে মোটেই সামনে নিয়ে আসবে না। প্রকৃত তথ্যের অভাবে ক্ষতিকর প্রকল্পগুলি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট জনসম্প্রদায় সহ দেশের নাগরিক অন্ধকারে থেকে যাবে। মূল্যায়ন রিপোর্টগুলি কার্যত হয়ে দাঁড়াবে প্রকল্প-মালিকদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার, পরিবেশ-সুরক্ষার নামে একটি প্রহসন।

প্রহসনের মধ্যেও হয়তো কিছু আশার ঝিলিক থাকে। বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকেও, হয়তো আঁকড়ে ধরার মতো একটা ইতিবাচক পথ ও সম্ভাবনা কিছুটা হলেও বেঁচে থাকে। সেটা হল জনশুনানি — যে-কোনো প্রকল্প রূপায়নের জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে বিশেষ করে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্তদের তরফে তো বটেই, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ নাগরিকদের মতামত, পরামর্শ, আপত্তি ও প্রতিবাদ জানানোর পরিসর। এমন একটি পরিসর বা ব্যবস্থাপনা, যা দিয়ে তারা যে-কোনো প্রকল্প বিষয়ক সিদ্ধান্তকে কার্যকরী ভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কায়েমি স্বার্থ বিশেষ করে প্রস্তাবিত বা চালু প্রকল্প এলাকাগুলিতে স্থানীয় ভাবে নাগরিকদের অশিক্ষা ও পশ্চাৎপদতার সুযোগ নিয়ে কখনো প্রশাসনিক স্তরে প্রভাব খাটিয়ে, কখনো-বা ভয় দেখিয়ে, পুলিশি সন্ত্রাস চালিয়ে, গুন্ডা লাগিয়ে জনমত সংহত করার পথে বাধা তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, জনশুনানির প্রক্রিয়ায় নির্ধারক বিশেষজ্ঞ কমিটির (Expert Appraisal Committees বা EACs) মধ্যস্থতায় প্রকল্প-প্রস্তাবকারী স্থানীয় সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে সমঝোতায় আসে সামান্য কিছু টাকা বিনিয়োগ করেই — কয়েকটা নলকূপ বসিয়ে দিয়ে, বা স্কুল-বাড়ি তৈরি করে দিয়ে। আর পরিবেশ মন্ত্রকও (MoEF&CC) এটাকে অনায়াসে বৈধতা দিয়ে দেয় প্রকল্প বা শিল্প-সংস্থাগুলির সামাজিক দায়বদ্ধতা (Corporate Environment / Social Responsibility, CSR, CER) মেটানোর নামে, যার মূল্য ওদের মোট লগ্নি করা পুঁজির ০.১২৫ থেকে ২ শতাংশ মাত্র! জনমত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে এর অসংখ্য উদাহরণ আছে। যেন টাকা দিয়েই মানুষের জীবনজীবিকা ও পরিবেশের সমস্ত ক্ষতি আবার পূরণ করে দেওয়া যায়!

প্রকৃত সত্যটা হল, আইন থাকা সত্ত্বেও, তা সে যতই ঠুঁটো হোক না কেন, বেসরকারি ও সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত স্তরে সেগুলির যথাযথ প্রয়োগের অভাবে পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে ও করে দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ ছাড়পত্রও দেওয়া হচ্ছে যথেচ্ছ ভাবে। যে-সমস্ত শর্ত প্রকল্প-প্রস্তাবকারীদের উপর রাখা হচ্ছে সেগুলি দুর্বল তো বটেই, সেগুলির উপর নজরদারি প্রায় নেই বললেই চলে। বা নজরে পড়লেও টাকা দিয়ে সে-নজর অনায়াসে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।

এখনও পর্যন্ত ব্যবস্থাটা এ-রকম করা আছে যে প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রকল্প-কর্তৃপক্ষ নিজেই একটা প্রতিবেদন বা রিপোর্ট দাখিল করবে যে তার জন্য বেঁধে দেওয়া পরিবেশ সুরক্ষার শর্ত ও নিয়মগুলি সে ভাঙছে না। খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’-তে এই সামান্য দায় থেকেও প্রকল্প-কর্তৃপক্ষকে রেহাই দিয়ে রিপোর্ট দেওয়ার সময়সীমা এক বছর করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে এই সময়সীমা আরও কমিয়ে প্রকল্পগুলির উপর নজরদারি আরও কঠোর হওয়া উচিৎ ছিল।

পরিবেশ মূল্যায়নের কাজ যদি হয় প্রস্তাবিত প্রকল্পের ফলে পরিবেশের উপর অনুকূল ও প্রতিকূল প্রভাবগুলিকে পরীক্ষা করে দেখা, তা হলে পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর পদক্ষেপগুলিকে শর্ত দিয়ে এমন একটা সহনীয় মাত্রায় বেঁধে রাখা দরকার যাতে প্রকল্পের কোনো কার্যকলাপ পরিবেশ ও মানুষের এমন কোনো ক্ষতি না করে ফেলতে পারে যাকে আর কোনো দিনই পূরণ করা যাবে না। স্বাভাবিক ভাবেই এর মূল্যায়নের আওতায় পড়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাবও। কিন্তু খসড়া বিজ্ঞপ্তি অনুসারে বেশির ভাগ স্পর্শকাতর প্রকল্পগুলির পরিবেশ-সুরক্ষা শর্ত লঙ্ঘন সম্পর্কে নাগরিকরা কোনো অভিযোগ সরকারের কাছে জানাতে পারবে না, শর্ত লঙ্ঘন সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার অধিকারী কেবলমাত্র সরকারি আমলারা!

খসড়া ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বিজ্ঞপ্তি ২০২০’ হাঁটছে সম্পূর্ণ উলটো দিকে মুখ করে। স্বাভাবিক ভাবেই পরিবেশবিদরা আপত্তি তুলেছে। ২০১৬ সালের ক্যাগ রিপোর্টেও[15] বলা হয়েছে যে প্রকল্প-কর্তৃপক্ষের ছয় মাস অন্তর দেওয়া রিপোর্টে ঘাটতি ৪৩% থেকে ৭৮%, যেখানে শর্ত ভাঙার ঘটনা ঘটছে ৫% থেকে ৫৭% ক্ষেত্রে। বিশেষ করে নদী-উপত্যকা এবং জল-বিদ্যুৎ ও তাপ-বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রেই শর্ত ভাঙার ঘটনাগুলি বেশি ঘটেছে।

এক ভাষা এক সংস্কৃতির খিচুড়ি ভোগ এবং আদালতের রায়

কেন্দ্রীয় সরকারের আস্তিনের ভাঁজে ভাঁজে কী কী চাল লুকনো আছে তা বুঝতে গিয়ে নানা পদক্ষেপ এবং নিম্ন থেকে এমনকী শীর্ষ আদালতের রায়গুলির অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সঙ্গত কারণেই আশান্বিত হওয়ার বদলে আশঙ্কিতই বেশি হই। প্রথম থেকেই সরকার-পক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হচ্ছে যাতে খসড়া বিজ্ঞপ্তিটি দেশের বিপুল জনসম্প্রদায় হাতে না পায়, চর্চা না করতে পারে, বুঝতে না পারে খসড়ায় লেখা কোন কোন দিকগুলি বিশেষ করে সরাসরি স্থানীয় মানুষদের স্বার্থের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনে তারা তার বিরুদ্ধে আপত্তি-প্রতিবাদ জানাতে পারে। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় ভাষা ও সংস্কৃতির দেশে খসড়া বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করা হয়েছে শুধুমাত্র ইংরেজি ও হিন্দিতে। ব্যাপারটা এমন যেন একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই ইংরেজি অথবা হিন্দিতে কথা বলতে পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ!

ভারতের সংবিধানের আর্টিকল-২১ অনুযায়ী যে-কোনো গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জন-অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকৃত! গোড়া থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের এই জানার অধিকারটিকেই খর্ব ও সঙ্কুচিত করতে চেয়েছে ‘সরকারি ভাষা আইন, ১৯৬৩’-র দোহাই দিয়ে, যেখানে শুধু হিন্দি ও ইংরেজিতেই সরকারি কাজকর্ম করার বিধান দেওয়া আছে। খসড়া পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বিজ্ঞপ্তি ২০২০ শুধুমাত্র হিন্দি ও ইংরেজিতে নাগরিকদের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে এবং অন্যান্য ভাষাভাষীদের মতামত জানানোর অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে অভিযোগ পাওয়ার পর দিল্লি বা কর্নাটকের উচ্চ-আদালত কেউই নিজেদের উষ্মা গোপন করেনি।  দিল্লির উচ্চ-আদালত এ-প্রসঙ্গে আগেই ৩০ জুন জানিয়ে দেয় নাগরিকদের মতামত নেওয়ার জন্য ১০ দিনের মধ্যে অন্তত ২২টি তালিকাভুক্ত আঞ্চলিক ভাষায় খসড়াটি প্রকাশ ও প্রচার করতে হবে, আর মতামত নেওয়ার সময়সীমাও বাড়িয়ে করা হয় ১১ অগাস্ট। ঠিক হোক বা বেঠিক, সরকারি কোনো পদক্ষেপ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি নাগরিকরা যদি জানতে বা পড়তেই না পারেন, তা হলে নাগরিকরা তাতে সম্মতি বা অসম্মতি জানাবেন কী করে?

তবুও, কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক টালবাহানার পরেও, ৫ অগাস্ট ২০২০ কর্নাটকের উচ্চ-আদালত যখন খসড়া পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বিজ্ঞপ্তি ২০২০ চূড়ান্ত করার উপর স্থগিতাদেশ দিয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ২ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করে, “…প্রাথমিক ভাবে দেখে আমাদের মনে হচ্ছে নাগরিকদের আপত্তি জানানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে”[16], তখন কিছুটা স্বস্তি আসে বইকি! হতে পারে তা সাময়িক।

বিক্রি করো, তহবিল ভরো’!

এই খসড়ার মাধ্যমে এক দিকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তার সমস্ত রকম আইনি রক্ষাকবচগুলিকে সরিয়ে নিয়ে তাদের প্রত্যক্ষ ভাবে লুঠ করতে দেওয়ার বন্দোবস্ত পাকা করে দেওয়া হচ্ছে, অন্য দিকে, ব্যক্তি-পুঁজি যাতে কোনো আইনি প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই সম্পূর্ণ আইনসম্মত ভাবে দেশের বিপুল প্রাকৃতিক ও শ্রম সম্পদকে সস্তায় ও অবাধে লুঠ করতে পারে তার জন্য তাদের সমস্ত রকম আইনি রক্ষাকবচ দিয়ে সুরক্ষিত করে তোলাটাই এই নয়া ফরমানের লক্ষ্য। আর এর বিনিময়ে সেই সমস্ত সুবিধাপ্রাপকদের কাছ থেকে বন্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন একটি দলের জন্যই সহজে সংগ্রহ করার রাস্তাটাও মসৃণ হয়ে যাচ্ছে।

গোটা প্রক্রিয়ার মধ্যে একই সঙ্গে অত্যন্ত সুরক্ষিত উপায়ে নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের অর্থভাণ্ডার আরও স্ফীত হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও — আপাত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে “বন্ড”-এর চেহারায় বিভিন্ন শিল্পপতিদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের মাধ্যমে। এও আবার তারা ব্যবহার করছে ও করবে মিথ্যা প্রচারে, জনপ্রতিনিধি কেনাবেচায়। বিচারের রায়কে নানা ভাবে প্রভাবিত করায়, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে চুপ করিয়ে দেওয়ায় বা একেবারে স্তব্ধ করে দেওয়ায়। আসলে এটা একটা সুচিন্তিত বড় পরিকল্পনার ভগ্নাংশ মাত্র, ‘বিক্রি করো, তহবিল ভরো’! নির্বিচারে এমনকী অমূল্য পরিবেশ ধ্বংস করে প্রাকৃতিক ও জনসম্পদ লুঠ করার আইনি পরিকাঠামোই শুধু তৈরি করে দেওয়া হবে না, লুণ্ঠনে তারাই অগ্রাধিকার পাবে, যারা শাসক দলের তিজোরি ভরে দেওয়ার শর্তে রাজি থাকবে সেই সমস্ত পছন্দের অর্থ-লগ্নিকারীরা। এত সুগ্রথিত ও মসৃণ পদ্ধতি এখন বিরোধী আসনে নড়বড়ে ভাবে বসা আগেকার শাসকদলগুলিও কোনো দিন ভাবতে পারেনি।

*************

বিষয়টা এমন নয় যে এখন সব কিছুই একেবারে ঠিকঠাক চলছে, আর এই খসড়াটি আইনে পরিণত হলেই সব কিছু ওলটপালট হয়ে মহা-সর্বনাশ হয়ে যাবে। তা মোদি সরকারের শাসনে পরিবেশ ও মানুষের উপর আক্রমণ নতুন কিছু নয়। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মোদি-সরকার চালু পরিবেশ ও জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত আইনগুলিকে সংশোধন করে পরিবেশের পক্ষে স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতেও অবাধে পুঁজির অনুপ্রবেশের অনুকূল ক্ষেত্র তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়ে দেয়।

২০১৪ সালের ১৬ জুলাই-এ লোকসভায় প্রকাশ জাভড়েকর জানায় যে সরকার “এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাইওয়ে সহ লিনিয়ার প্রকল্পগুলির জন্য পরিবেশ এবং বন সম্পর্কিত ছাড়পত্রের কোনো সম্পর্ক নেই”।[17] অর্থাৎ, বন নয় এমন জমিতে প্রকল্পের জন্য আর বন-সম্পর্কিত ছাড়পত্র আর নিতে হবে না। লিনিয়ার প্রকল্প হল, বহুতল, হাইওয়ে, রেললাইন, পাইপলাইন ইত্যাদি। প্রকাশ জাভড়েকরের পরিবেশ মন্ত্রক এই মর্মে ২০১৪ সালের ২০ অগাস্ট সমস্ত রাজ্যগুলিকে বিজ্ঞপ্তি[18] পাঠিয়ে বনাঞ্চলে কোনো প্রকল্প করার জন্য কেবলমাত্র সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভিতরের এলাকা ছাড়া অন্যান্য সব জমিতে ছাড়পত্র দেওয়ার সমস্ত দায়ভার থেকে বন্যপ্রাণী জাতীয় পর্ষদকে (National Board of Wild Life বা NBWL) মুক্ত করে দেয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কোনো প্রকল্প করতে গেলে বন্যপ্রাণী জাতীয় পর্ষদ থেকে ছাড়পত্র লাগত। সেটাকে কমিয়ে করে দেয় ৫ কিলোমিটার। পর্ষদের বাধ্যতামূলক সদস্য-সংখ্যাকে কেটে-ছেঁটে আয়তনেও ছোট করে দেওয়া হয়। যে পর্ষদ এত দিন পরিবেশ-সংরক্ষণের জন্য একটা ঢালের মতো কিছুটা হলেও কাজ করছিল, তা পরিণত হয় সরকারের নিছক এক রাবার-স্ট্যাম্পে।

আদিবাসী সম্প্রদায়ের গ্রাম-সভাগুলিকেও দুর্বল করে দেওয়ার প্রক্রিয়া তখন থেকে শুরু হয়ে যায় জোর-কদমে। যদিও সে রাস্তা তত মসৃণ হয়নি। সে বছরই ২৮ অক্টোবর মাসে পরিবেশ মন্ত্রক তার নির্দেশে[19] কোনো শিল্প প্রকল্প করা বা বনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন কোনো কাজ চালানোর জন্য বন-এলাকার জমি অধিগ্রহণ বা বন কেটে ফেলার ক্ষেত্রে গ্রাম-সভাগুলির “স্বাধীন, আগাম এবং অবহিত সম্মতি” নেওয়ার বাধ্যবাধকতাকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ ২০০৬ সালের বন-অধিকার আইনে বনাঞ্চলের ওপর আদিবাসী ও অ-আদিবাসী জনসম্প্রদায়গুলির অধিকার সুরক্ষিত। কোনো প্রকল্পের জন্য জমিই তাদের সম্মতি ছাড়া নেওয়া যায় না। সরকারেরই ‘আদিবাসী-বিষয়ক মন্ত্রক’ তীব্র আপত্তি জানায়। ১২ নভেম্বর ২০১৪-র এক কড়া চিঠিতে পরিবেশ মন্ত্রকের ওই নির্দেশ ফিরিয়ে নিতে বলে জানায়, “বন-আইন (FRA) দেশের আইন। ওই নির্দেশ আইন ভাঙছে”। পরিবেশ মন্ত্রক সাময়িক ভাবে হলেও পিছু হটতে বাধ্য হয়। খসড়া বিজ্ঞপ্তি এই প্রচেষ্টারই এক সংহত রূপ।  

আমাদের বাস্তু-সংস্থান কি ক্রমশ সহনশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে? যদি তা না হয়ে থাকে, তা হলে কী কারণে পরিবেশ আইন ও তার শর্তগুলির কড়াকড়ি কমিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়ে উঠেছে সরকার?

এমন কোনো প্রমাণ নেই যে ‘ছাড়পত্র’র সমস্যা উঠে গেলে, নাগরিকদের নজরদারি তুলে দিলেই অর্থনৈতিক বিকাশের গতি সাবলীল হয়ে যাবে। কারণ, ২০১৪ সাল থেকে কোনো প্রকল্প প্রায় আটকে নেই। কিন্তু ১০০ শতাংশ প্রকল্পই ‘ছাড়পত্র’ পেয়ে গেলেও অর্থনৈতিক বিকাশ ক্রমশই মুখ থুবড়ে পড়ছে।

এই খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’ গড়ার একটাই লক্ষ্য, কী কী উপায়ে ‘পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়ন’কে এড়িয়ে গিয়ে প্রকল্পগুলির জন্য পরিবেশ ‘ছাড়পত্র’ পাওয়ার সমস্যা কমিয়ে দেওয়া যায়, বা একেবারেই তুলে দেওয়া যায়। একই ভাবে বিশেষজ্ঞ বা নাগরিকদের আতশকাঁচের নিচে প্রকল্পগুলির থমকে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়, বা এই প্রক্রিয়ায় একেবারেই না আসতে হয়।

পরিবেশ নিয়ে এমনিতেই আমাদের দেশে লোকে খুব কমই মাথা ঘামায়। যেন এটা শুধুমাত্র পরিবেশ সংগঠনগুলিরই দায়। সন্ত্রাসদমন বা তথ্য আইন প্রয়োগ করে পরিবেশ সংগঠনগুলির উপর নিষেধাজ্ঞা চাপানোর উলটো প্রতিক্রিয়াও আছে।

‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’ এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশের পরিবেশ সুরক্ষার একমাত্র আইনি সংস্থান। তৈরি হওয়ার পর থেকে সময়ান্তরে এটি ৪৩বার[20] সংশোধিত হয়েছে শুধু তাই নয়, একে পরিমার্জিত করতে অন্তত ৫০টি সরকারি নির্দেশ এর সঙ্গে জুড়ে গেছে।[21] পৃষ্ঠায় গুনলে ডিসেম্বর ২০১৪ থেকে জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত তার পৃষ্ঠা-সংখ্যা হবে প্রায় ৩৫০! যদিও পরিবেশ মন্ত্রী জাভরেকরের দেওয়া তথ্য থেকে আমরা জানতে পারি, ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’ মোট ৫৫ বার সংশোধিত হয়েছে।[22] ২৩০টি অফিস মেমোরেন্ডাম এর সঙ্গে জুড়ে গেছে। ফলে বলাই যায়, ইতিমধ্যেই অনেক বদলে গেছে আসল ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’। কার্যত, খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’ এই সমস্ত অদলবদলগুলিকে এক জায়গায় করে আরও সংহত এমন একটা খসড়া আইন, যেখানে আসলটি অনেকাংশে ধীরে ধীরে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নজর এড়িয়ে গিয়ে, আগেই গেছে হারিয়ে! তবে একথা বলতেই হবে, তুলনামূলক বিচারে ব্যাপক পরিবর্তন হয়তো খসড়াটিকে বলা যাবে না, কিন্তু সুচতুর মোচড় সহ সংহত চেহারায় এই খসড়া ‘বিজ্ঞপ্তি ২০২০’ যদি আইনে পরিণত হয়, তার পরিণতি যে আরও লাগামছাড়া বিপজ্জনক হয়ে উঠবে সে-ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এখনকার ‘বিজ্ঞপ্তি ২০০৬’ নিজেই পরিবেশের যথেষ্ট ক্ষতি করার পক্ষে কম সক্ষম নয়, আর সেটা সে করেই চলেছে। পরিবেশের কোনো উন্নতি হয়নি। বরং দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিগুলি বার বার বদল হয়েছে পরিবেশের দিকে তাকিয়ে নয়, বরং শুধুমাত্র প্রকল্পগুলির সুবিধা করে দেওয়ার জন্য।

‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন’-এর কাজের খতিয়ান নিতে গেলে অবাক হতে হয়। সরকার আর অর্থলগ্নিকারীদের মিলিত বেপরোয়া উদ্যোগে পুঁজির লালসার সামনে এ-এক অসম্ভব অসহায় বঞ্চনার ইতিহাস। যুগপৎ পরিবেশ আর মানুষ হত্যার ইতিহাস।

ভারতের রাজনীতিতে এ-এক অভূতপূর্ব ক্ষমতা-কাঠামো ক্রমেই দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিরোধী শক্তিগুলিকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়ে উল্লম্ব ভাবে বেড়ে ওঠা এক একক ক্ষমতা-কাঠামো। বেড়ে ওঠার জন্য যে দ্রুত নিংড়ে নিচ্ছে নিজের ভিত, জমির সমস্ত রস — যা তার টিঁকে থাকার প্রাথমিক শর্ত। এ যদি তার বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার শুরু হয়, তা হলে এই প্রক্রিয়ার অন্য এক প্রান্তে রয়েছে তার বিনাশেরও অমোঘ শর্ত। অন্য এক রসায়নের জন্মের বীজ!  

দূষণ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার জন্য পরিবেশ ভারসাম্য চরম বিপদের মুখোমুখি। সারা পৃথিবী জুড়েই এখন পরিবেশ-সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে। অবশ্যই তা এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি শাসকদের ঘাড় ধরে পরিবেশ রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করবে। আমাদের দেশে যদিও বিভিন্ন পরিবেশ সংগঠন ও সচেতন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্বদের সক্রিয়তা আশা জাগায়, কিন্তু এই সচেতনতা এখনও কম। এখনও পরিবেশ আন্দোলন একটা প্রায় বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদী ধারা, যাকে সহজেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে তোলা শাসকদের পক্ষে মোটেই কঠিন কাজ নয়। কাজটা শাসকদের পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে উঠত, যদি বিশেষ করে শ্রমজীবী সংগঠনগুলি নিছক পেশাগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পরিবেশ আন্দোলনে নিজেদের সক্রিয় উপস্থিতি রাখতে পারত, যা প্রকৃত অর্থেই একটা ফারাক গড়ে দিতে পারে।

সূত্র:

[1] Draft Environment Impact Assessment Notification 2020 http://environmentclearance.nic.in/writereaddata/Draft_EIA_2020.pdf

[2] Draft EIA Notification 2020: Dilutes EIA process & encourages violations https://sandrp.in/2020/06/23/draft-eia-notification-2020-dilutes-eia-process-encourages-violations/

[3] Need to turn Covid Crisis into an Opportunity: PM Modi https://www.thehindubusinessline.com/economy/need-to-turn-covid-crisis-into-an-opportunity-pm-modi/article31802057.ece

[4] NRC or No NRC: Who Is Lying, Narendra Modi or Amit Shah? https://www.youtube.com/watch?v=Z__6E5hPbHg&feature=youtu.be; https://thewire.in/politics/narendra-modi-amit-shah-nrc

[5] Citing Anti-Terror Law, Delhi Police Block Global Youth Climate Activism Website https://thewire.in/environment/fridays-for-future-website-block-eia-prakash-javadekar-uapa

[6] SC refuses to restrain Rajasthan HC from passing Friday order on rebel Cong MLAs’ plea https://www.tribuneindia.com/news/nation/voice-of-dissent-in-a-democracy-cannot-be-shut-down-sc-tells-rajasthan-speaker-116911

[7] The Environment (Protection) Act, 1986 http://bch.cbd.int/database/attachment/?id=19052

[8] Institutionalising Information Blindspots -Draft EIA Notification 2020 https://www.epw.in/journal/2020/28-29/commentary/draft-eia-notification-2020.html 

[9] Government pushes for post facto environment clearances while apex court disapproves https://india.mongabay.com/2020/04/government-pushes-for-post-facto-environment-clearances-while-apex-court-disapproves/

[10] Monoj Mishra vs Union of India Ors. National Green Tribunal 2015 https://www.casemine.com/judgement/in/5c06187ab338d16e11efe75b; Draft EIA in line with green rules, court rulings: Prakash Javadekar, Environment Minister http://www.ecoti.in/mhweOb

[11] Rebooting Economy IV: Is govt using environmental laws to protect polluting industries? https://www.businesstoday.in/current/economy-politics/indian-economy-is-govt-using-environmental-laws-to-protect-polluting-industries/story/409308.html; http://ismenvis.nic.in/Database/Notification_14th_March_2017-SO804E_14507.aspx; http://environmentclearance.nic.in/ViewB_order.aspx?rid=83&pid=Andhra%20Pradesh

[12] পৃষ্ঠা: ৪৩-৪৪, http://moef.gov.in/wp-content/uploads/2019/04/Compendium-of-OMs_reduce.pdf; http://environmentclearance.nic.in/ViewB_order.aspx?rid=161&pid=Telangana

[13] LG Polymers: Was negligence behind India’s deadly gas leak? https://www.bbc.com/news/world-asia-india-52723762#:~:text=The%20Indian%20arm%20of%20LG,its%20plant%20killed%2012%20people.&text=People%20who%20live%20close%20to,May%20to%20a%20pungent%20smell.

[14] The Report Of The High-Power Committee On The Styrene Vapour Release Accident at  M/s LG Polymers India Pvt. Ltd. https://www.ap.gov.in/wp-content/uploads/2020/07/The-High-Power-Commitee-Report.pdf

[15] Report of the Comptroller and Auditor General of India on Environmental Clearance and Post Clearance Monitoring https://cag.gov.in/sites/default/files/audit_report_files/Union_Government_Report_39_of_2016_PA.pdf

[16] Draft EIA Notification 2020: Karnataka HC Restrains Centre From Publishing Final Notification Till Sep 7 https://www.livelaw.in/top-stories/eia-notification-2020-karnataka-hc-restrains-centre-from-publishing-final-notification-till-sep-7-160985?infinitescroll=1

[17] Govt to delink environment, forest clearances for linear projects https://economictimes.indiatimes.com/wealth/personal-finance-news/govt-to-delink-environment-forest-clearances-for-linear-projects/articleshow/38494850.cms

[18] Ministry double standards on NH7 widening to the fore https://timesofindia.indiatimes.com/city/nagpur/Ministry-double-standards-on-NH7-widening-to-the-fore/articleshow/46279762.cms

[19] Don’t violate Forest Rights Act, MoEF told https://indianexpress.com/article/india/india-others/dont-violate-forest-rights-act-moef-told/

[20] Amendments in the EIA Notification, 2006 http://moef.gov.in/wp-content/uploads/2019/04/Compendium-of-OMs_reduce.pdf

[21] Environmental hot potato: Current EIA process is defunct. Parliament must legislate a new law based on sound science https://timesofindia.indiatimes.com/blogs/toi-edit-page/environmental-hot-potato-current-eia-process-is-defunct-parliament-must-legislate-a-new-law-based-on-sound-science/

[22] Draft EIA in line with green rules, court rulings: Prakash Javadekar, Environment Minister http://www.ecoti.in/mhweObhttp://moef.gov.in/wp-content/uploads/2019/04/Compendium-of-OMs_reduce.pdf

অন্যান্য সূত্র:

(a) How the Centre is diluting green clearance norms https://www.downtoearth.org.in/blog/urbanisation/how-the-centre-is-diluting-green-clearance-norms-62828

(b) EIA notification 2020 delayed till September 7 https://www.downtoearth.org.in/news/environment/eia-notification-2020-delayed-till-september-7-72673

(c) Comments & Objections on Draft EIA Notification 2020 https://vindhyabachao.org/embeds/Representation_DraftEIA2020_VENHF_27_April_2020.pdf 

(d) Objections of PUCL Maharashtra to the Draft EIA Notification 2020 https://puclmaharashtra.wordpress.com/2020/08/13/objections-of-pucl-maharashtra-to-the-draft-eia-notification-2020/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *